বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০১:২২ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশের ফুটবল বদলায় না

আল আমীন অর্ণব / ৫১ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন এক অন্য রূপ নেয়। পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দর সবখানেই শুরু হয় ফুটবল উৎসব। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায় ছেয়ে যায় রাস্তা। রাত জেগে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থনের ঝড়, এমনকি কখনো কখনো মারামারি পর্যন্ত হয় ফুটবলকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেখানে ফুটবলকে শুধুই খেলা হিসেবে দেখে, সেখানে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটি আবেগ, ভালোবাসা এবং পরিচয়ের অংশ।

কিন্তু এই উন্মাদনার মাঝেও একটি প্রশ্ন প্রতি বিশ্বকাপেই ফিরে আসে, বাংলাদেশ কোথায়?

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে বাংলাদেশের কোনো উপস্থিতি নেই। নেই মাঠে, নেই আলোচনায়, নেই প্রতিযোগিতার মূল মঞ্চে। অথচ ফুটবলপ্রেমী জাতি হিসেবে বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশি গণমাধ্যমও প্রায়শই বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু কোটি মানুষের এই ভালোবাসা কখনোই জাতীয় দলের সাফল্যে রূপ নেয়নি।

একসময় বাংলাদেশ ফুটবলে পিছিয়ে ছিল না। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিতি ছিল দেশের। ১৯৮০ সালের এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলেছিল বাংলাদেশ। তখন অনেকেই বিশ্বাস করতেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ফুটবল আরও এগিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। যে দেশগুলো একসময় বাংলাদেশের সমকক্ষ ছিল, তারা এখন অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে আজ পাঁচ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দে আলোচনায় আসে। আইসল্যান্ড, পানামা কিংবা কোস্টারিকার মতো ছোট দেশগুলোও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। অথচ প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের নিচের সারিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, সমস্যা কোথায়?

সমস্যার শুরু প্রশাসন থেকেই। বছরের পর বছর ফুটবল পরিচালনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তন হয়নি কাঠামোর। ফুটবল ফেডারেশনে নেতৃত্ব এসেছে, নেতৃত্ব গেছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে উন্নয়ন হয়নি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের লিগগুলো ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। একসময় যে মাঠগুলোতে প্রতিদিন ফুটবল গড়াতো, সেখানে এখন আগাছা জন্মায় কিংবা অন্য কাজে ব্যবহার হয়।

দেশের অধিকাংশ প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসে গ্রাম থেকে। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করার জন্য কোনো কার্যকর স্কাউটিং ব্যবস্থা নেই। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা নিয়মিত হয় না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে অনেক প্রতিভাই অঙ্কুরেই ঝরে যায়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক প্রভাব। ফুটবলকে ঘিরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক সময় খেলাধুলার চেয়ে ব্যক্তিগত কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পায়। বিশ্বের সফল দেশগুলো খেলাকে রাজনীতির বাইরে রাখতে চেষ্টা করে। যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল একসময় জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু পরিকল্পিত বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। একইভাবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সৌদি আরবও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল পাচ্ছে।

বাংলাদেশে পরিকল্পনার চেয়ে বেশি দেখা যায় ব্যক্তি নির্ভরতা। কোনো একজন কর্মকর্তা বা সংগঠকের ওপর পুরো ব্যবস্থাকে নির্ভরশীল করে তোলা হয়। ফলে ব্যক্তি চলে গেলে উদ্যোগও থেমে যায়। অথচ ফুটবল উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, যা বছরের পর বছর ধরে বজায় রাখতে হয়।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, ফুটবল নিয়ে মানুষের আবেগের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। বিশ্বকাপ এলেই কোটি কোটি মানুষ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের হয়ে উল্লাস করে। মেসি গোল করলে আনন্দে ভাসে, হারলে কাঁদে। কিন্তু নিজেদের জাতীয় দলের খেলা নিয়ে সেই একই উত্তেজনা দেখা যায় না। কারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শিখেছে, বাংলাদেশ ফুটবলে বড় কিছু করতে পারবে না।

তবুও আশার জায়গা আছে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী ফুটবলে বাংলাদেশের সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে যে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে অসম্ভব কিছু নয়। বয়সভিত্তিক নারী দলগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বও পেয়েছে। অর্থাৎ প্রতিভার অভাব নেই, অভাব সঠিক ব্যবস্থাপনার।

বাংলাদেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে হবে। স্কুল ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, দক্ষ কোচ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফুটবল প্রশাসনে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

বিশ্বকাপ শুধুমাত্র একটি টুর্নামেন্ট নয়। এটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক। প্রতি চার বছর পরপর আমরা অন্য দেশের পতাকা হাতে রাস্তায় নামি, অন্য দেশের জয় উদযাপন করি। কিন্তু একদিন যদি বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বিশ্বকাপের মঞ্চে উড়ে, তাহলে সেই আনন্দের সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হবে না।

প্রশ্ন হলো, সেই দিন কি আসবে?

উত্তর অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, পরিকল্পনা এবং বাস্তব কাজ। কারণ ফুটবলপ্রেমী মানুষের দেশে প্রতিভার অভাব নেই। অভাব শুধু সঠিক দিকনির্দেশনার।

বিশ্বকাপের উন্মাদনা আবারও একদিন শেষ হয়ে যাবে। আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের পতাকাও একসময় গুটিয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে প্রশ্নটি থেকে যাবে আগের মতোই।

কেন আমরা শুধু দর্শক?

কেন আমরা শুধু অন্যের সাফল্যে হাততালি দিই?

আর কতদিন?

বাংলাদেশের ফুটবল বদলায় না। কিন্তু বদলাতেই হবে। কারণ ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন চিরকাল সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর