স্পেনের পায়ের জাদুতে থামল মেসির স্বপ্ন
খেলার শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে লিওনেল মেসি দুই হাত কোমরে রেখে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখের সামনে তখন লাল জার্সিধারীদের উল্লাস। আরেক পাশে নীরব আকাশি-সাদা শিবির। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল শুধু একটি শিরোপা নির্ধারণ করেনি, এটি যেন ঘোষণা করেছে—ফুটবলের সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও দলগত নৈপুণ্যের কাছে ব্যক্তিগত মহিমাও কখনো কখনো ম্লান হয়ে যায়। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো স্পেন।
নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই নিজেদের পরিচিত ছন্দে খেলতে থাকে স্পেন। মাঝমাঠে রদ্রি, গাভি ও পেদ্রির নিখুঁত পাসিংয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রায় পুরোটা সময় তাদের দখলে। আর্জেন্টিনা অপেক্ষায় ছিল মেসির পায়ে কোনো জাদুকরী মুহূর্তের। কিন্তু স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ সেই সুযোগ তৈরি হতে দেয়নি।
প্রথমার্ধেই ম্যাচে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। ৪১ মিনিটে স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবালকে কঠোর ট্যাকল করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। বিরতির পর স্পেন বলের দখল আরও বাড়িয়ে দেয়। মেসিদের হতাশা বাড়তে থাকে, আর সেই হতাশার ছাপ পড়তে থাকে তাদের খেলায়।
নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে একের পর এক কঠোর ফাউল করতে থাকে আর্জেন্টিনা। ৮২ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ হলুদ কার্ড দেখেন। যোগ করা সময়ে ৯০+১ মিনিটে স্পেনের আইমেরিক লাপোর্তেও হলুদ কার্ড পান। এর এক মিনিট পর ৯০+২ মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য হলুদ কার্ড দেখেন। ম্যাচের উত্তেজনা তখন চরমে।
অতিরিক্ত সময়েও আগ্রাসী মনোভাব থেকে সরে আসতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ৯০+৩ মিনিটে পাও কুবারসির ওপর বিপজ্জনক ট্যাকল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। ফলে লাল কার্ড দেখে দশজনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে স্পেন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।
এরপরই আসে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণী মুহূর্ত। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধে নিকো উইলিয়ামসের দুর্দান্ত আক্রমণ থেকে তৈরি হওয়া সুযোগে ফেরান তোরেস ডান পায়ের শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। পুরো স্টেডিয়াম তখন লাল উল্লাসে ফেটে পড়ে। আর্জেন্টিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা চালালেও উনাই সিমনের দৃঢ়তা আর স্পেনের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ তাদের সব আশা ভেঙে দেয়।
শেষ বাঁশির পরও উত্তেজনা থামেনি। স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রেফারিকে আবারও কার্ড বের করতে হয়। ম্যাচ শেষে লিয়ান্দ্রো পারেদেস সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। ফাইনালে ফুটবল নৈপুণ্যের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার আগ্রাসী আচরণও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে পুরো ম্যাচজুড়ে স্পেন ছিল ধৈর্য, পরিকল্পনা আর নান্দনিক ফুটবলের প্রতীক। বলের দখল, আক্রমণ, পাসের সফলতা—সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল তারা। তাই শেষ পর্যন্ত শিরোপাও উঠেছে সবচেয়ে যোগ্য দলের হাতেই।
বিশ্বকাপজুড়েও ব্যক্তিগত পুরস্কারে ছিল স্পেনের দাপট। টুর্নামেন্টসেরা খেলোয়াড়ের গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি। সেরা গোলরক্ষকের গোল্ডেন গ্লাভ পেয়েছেন উনাই সিমন। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবারসি। আর সর্বোচ্চ গোলদাতার গোল্ডেন বুট জিতেছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পুরস্কারপ্রাপ্তরা
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন: স্পেন
রানার্সআপ: আর্জেন্টিনা
গোল্ডেন বল: রদ্রি (স্পেন)
গোল্ডেন বুট: কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স)
গোল্ডেন গ্লাভ: উনাই সিমন (স্পেন)
সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়: পাও কুবারসি (স্পেন)








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...