ডারউইনে ইতিহাস বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো তাদের মাটিতে টেস্ট জয়
অবিশ্বাস্য! রূপকথার মতো এক জয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম জয় পেল বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস লিখেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। ২০০৩ সালে যে মাঠে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ও ১৩২ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ, ২৩ বছর পর সেই মাঠেই প্রতিশোধের গল্প লিখলো টাইগাররা।
এ জয় শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। আর প্রতিপক্ষ যখন অস্ট্রেলিয়া, তখন জয়টির মাহাত্ম্য আরও বড়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ভাষায়, এটি বাংলাদেশের জন্য দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্জন।
শুরুটা করেছিলেন হাসান
ম্যাচের প্রথম দিন থেকেই অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখে বাংলাদেশ। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে ১৯৮ রানেই গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। একাই ছয় উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দেন হাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ারসেরা বোলিং করেন তিনি। স্টিভ স্মিথের ৭১ রান ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে বড় কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি।
জবাবে ব্যাট হাতে বাংলাদেশও দেখায় দৃঢ়তা। তানজিদ হাসান তামিম করেন ১০১ রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হন তিনি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাট থেকে আসে ৮৪। মেহেদী হাসান মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রানের ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ৪২৬ রান। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের বিশাল লিড পায় তারা।
মিরাজের ঘূর্ণিতে অস্ট্রেলিয়া শেষ
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া কিছুটা লড়াই করার চেষ্টা করলেও বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। ক্যামেরন গ্রিন এক প্রান্ত আগলে রেখে করেন ১০৪ রান। তার সেঞ্চুরি অস্ট্রেলিয়াকে কিছুটা আশা দেখালেও অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকে তারা।
মিরাজের স্পিনে একে একে ভেঙে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের ভিত আরও শক্ত করে দেন এই অলরাউন্ডার। শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
শেষ বাধাও টিকলো না
৫৭ রানের ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অবশ্য শুরুতেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসানকে শূন্য রানে ফেরান জশ হ্যাজেলউড।
তবে এরপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি মুমিনুল হক ও শাদমান ইসলাম। দুজনের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দ্রুতই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসে অপরাজিত ৩০ রান, শাদমান থাকেন ২৫ রানে অপরাজিত। মুমিনুলের ব্যাট থেকেই আসে জয়ের রান। অস্ট্রেলিয়ার বোলার বিউ ওয়েবস্টারকে চার মেরে জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
বাংলাদেশ তখন ৫৭/১। জয় ৯ উইকেটে।
মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রান। বল হাতে দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট। তার এই অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে।
অন্যদিকে হাসান মাহমুদের অবদানও কম নয়। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে ম্যাচে তার মোট শিকার দাঁড়ায় ৯টি। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হিসাবে, গত ১৫ বছরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সফরকারী কোনো বোলারের সেরা ম্যাচ বোলিংয়ের অন্যতম কীর্তি এটি।
২৩ বছর পর বদলে গেল দৃশ্যপট
২০০৩ সালে এই ডারউনেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল অসহায়। প্রথম ইনিংসে ৯৭ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭৮ রান করে ইনিংস ও ১৩২ রানে হেরেছিল তারা।
২৩ বছর পর একই মাঠে সেই অস্ট্রেলিয়াকেই হারিয়ে দিল বাংলাদেশ।
তাও আবার কোনো নাটকীয় শেষ মুহূর্তের জয় নয়। ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য দেখিয়ে, ব্যাট-বল-ফিল্ডিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে টেক্কা দিয়ে জয়।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এর আগে বাংলাদেশের কোনো টেস্ট জয় ছিল না। ২০১৭ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে সেটি ছিল দেশের মাটিতে। এবার সেই ইতিহাসও পেছনে ফেললো টাইগাররা। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ প্রতিবেদনে জয়টিকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বিশ্ব ক্রিকেটে আলোড়ন
বাংলাদেশের এই জয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেও বড় আলোড়ন তুলেছে। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটমাধ্যম ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটিকে বাংলাদেশের ‘ঐতিহাসিক’ জয় হিসেবে তুলে ধরেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয় হিসেবে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়েছে।
আর জয়টির গুরুত্ব বোঝাতে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট অঙ্গনের প্রতিক্রিয়াই যথেষ্ট। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গত দুই আসরের ফাইনালিস্ট এবং নিজেদের মাটিতে শক্তিশালী দল অস্ট্রেলিয়া। তাদের বিপক্ষেই বাংলাদেশ চার দিনের মধ্যে ম্যাচ শেষ করে দিল ৯ উইকেটের ব্যবধানে।
ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়
ডারউনের আকাশে রোববার তাই উড়েছে বাংলাদেশের পতাকা।
একদিকে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়। অন্যদিকে ২৩ বছর আগের সেই হারের মাঠেই প্রতিশোধের পূর্ণতা। তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি, শান্তর ৮৪, মিরাজের ৬৫ ও ৫ উইকেট, হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট আর মুমিনুল-শাদমানের ঠাণ্ডা মাথার শেষ কাজটি মিলেই রচিত হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস।
যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় ছিল বহু দূরের স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব।
ডারউইনে বাংলাদেশ ৯ উইকেটে হারালো অস্ট্রেলিয়াকে।
আর ক্রিকেট ইতিহাসে লেখা হয়ে গেল একটি নতুন বাক্য
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ এখন টেস্ট জয়ী দল।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...