বিশ্বকাপের আরেক আকর্ষণ ‘প্রাণী জ্যোতিষী’
ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়। মাঠের বাইরেও চলে নানা কৌতূহল, আলোচনা আর বিনোদনের আয়োজন। আর এসবের মধ্যে সবচেয়ে মজার ও আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো প্রাণীদের মাধ্যমে ম্যাচের ফলাফল ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করা। কখনো অক্টোপাস, কখনো উট, কখনো বিড়াল, হাতি কিংবা পান্ডা। বিশ্বকাপ এলেই যেন তারা হয়ে ওঠে কোটি মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
প্রাণীদের এই ভবিষ্যদ্বাণীর গল্প শুরু হয়েছিল অনেক আগে। তবে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জার্মানির ‘পল দ্য অক্টোপাস’।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বক্তা ‘পল’
জার্মানির ওবারহাউজেন সি লাইফ অ্যাকুয়ারিয়ামে থাকা পল নামের একটি অক্টোপাস বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণী। তার সামনে দুই দেশের পতাকাসংবলিত দুটি বাক্স রাখা হতো। যে বাক্স থেকে খাবার তুলতো, সেটিকেই ধরা হতো তার ‘পছন্দের’ দল।
অবিশ্বাস্যভাবে ২০১০ বিশ্বকাপে জার্মানির সাতটি ম্যাচের ফল এবং স্পেন-নেদারল্যান্ডস ফাইনালের ফলসহ মোট আটটি ম্যাচের ফল সঠিকভাবে অনুমান করেছিল পল। এরপরই রাতারাতি বিশ্বখ্যাত হয়ে ওঠে সে। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম তাকে আখ্যা দেয় ‘ওয়ার্ল্ড কাপ ওরাকল’।
পলের উত্তরসূরিদের ব্যর্থতা
পলের সাফল্যের পর বিশ্বকাপ ও ইউরোতে বিভিন্ন দেশে শুরু হয় প্রাণী ভবিষ্যদ্বক্তা খোঁজার প্রতিযোগিতা।
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ‘কাবেকাও’ নামের কচ্ছপ, জার্মানির হাতি নেলি এবং চীনের পান্ডা ভবিষ্যদ্বাণী করে আলোচনায় আসে। তবে পলের মতো ধারাবাহিক সাফল্য কেউই দেখাতে পারেনি।
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে আলোচনায় আসে রাশিয়ার বধির বিড়াল ‘আকিল’। সেন্ট পিটার্সবার্গের হারমিটেজ মিউজিয়ামে থাকা এই সাদা বিড়াল বেশ কয়েকটি ম্যাচের ফল সঠিকভাবে অনুমান করলেও শেষ পর্যন্ত শতভাগ সফল হতে পারেনি।
কাতার বিশ্বকাপে উটের ভবিষ্যদ্বাণী
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ‘ক্যামিলা’ নামের একটি উট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভিডিও ভাইরাল হয়। অনেক ম্যাচের ফলাফল নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করলেও বাস্তবে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে তার পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়।
তবে বিশ্বকাপের সময় এসব প্রাণীর ভিডিও, ছবি এবং ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে ভক্তদের মধ্যে তৈরি হয় বাড়তি উন্মাদনা।
বিজ্ঞান কী বলে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণীদের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। প্রাণীরা মূলত খাবার, রঙ, গন্ধ বা পরিবেশগত প্রভাবের কারণে নির্দিষ্ট কোনো পাত্র বা প্রতীকের দিকে আকৃষ্ট হয়। তবে কিছু পূর্বাভাস কাকতালীয়ভাবে মিলে গেলে সেটিই আলোচনার জন্ম দেয়।
পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন, দুই দলের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিলে স্বাভাবিকভাবেই ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে ফল মিলে যেতে পারে। ফলে কয়েকটি ম্যাচের ফল সঠিক হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপেও চলছে খোঁজ
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রাণীর ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ ভাইরাল হতে শুরু করেছে। কোনো চিড়িয়াখানার পেঙ্গুইন, কোথাও আবার কুকুর কিংবা লামাকে ব্যবহার করে ম্যাচের সম্ভাব্য বিজয়ী বেছে নেওয়া হচ্ছে।
যদিও এগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই, তবুও বিশ্বকাপের আনন্দকে বাড়িয়ে তুলতে প্রাণী ভবিষ্যদ্বক্তাদের জনপ্রিয়তা কমেনি একটুও।
বিশ্বকাপের বিখ্যাত প্রাণী ভবিষ্যদ্বক্তা
* পল (অক্টোপাস) — জার্মানি, ২০১০
* নেলি (হাতি) — জার্মানি, ২০১৪
* কাবেকাও (কচ্ছপ) — ব্রাজিল, ২০১৪
* আকিল (বিড়াল) — রাশিয়া, ২০১৮
* ক্যামিলা (উট) — কাতার, ২০২২
বিশ্বকাপের আসল ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় মাঠের ৯০ মিনিটে। তবুও পল অক্টোপাস থেকে শুরু করে উট, বিড়াল কিংবা হাতির ভবিষ্যদ্বাণী ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিশ্বকাপের এক মজার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপও খুঁজে পাবে তার নতুন কোনো ‘পল’, যে কয়েকটি সঠিক পূর্বাভাস দিয়েই আবারও জায়গা করে নেবে বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনামে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...