রুদ্ধশ্বাস লড়াই, অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার জয়যাত্রা
শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। শেষটাও হলো উৎসবের। মাঝখানে ছিল শঙ্কা, বিতর্ক, স্নায়ুচাপ আর টানটান উত্তেজনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে সুইজারল্যান্ড আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখলেও অতিরিক্ত সময়ে চ্যাম্পিয়নদের অভিজ্ঞতার কাছে হার মানল ইউরোপের দলটি। কানসাস সিটির স্টেডিয়ামে কোয়ার্টার ফাইনালের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল।
শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, অপেক্ষা করতে রাজি নয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ১০ মিনিটেই আসে প্রথম আঘাত। টানা দ্বিতীয় কর্নার থেকে নিখুঁত বল ভাসিয়ে দেন লিওনেল মেসি। প্রথম পোস্টে উঠে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের কিছুই করার ছিল না। ১-০ গোলে এগিয়ে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

গোল হজমের পর ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরতে শুরু করে সুইজারল্যান্ড। ৩২ মিনিটে ব্রিল এম্বোলো একাই ছুটে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার গোলের দিকে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের দারুণ ট্যাকল এবং গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের তৎপরতায় রক্ষা পায় আর্জেন্টিনা।
প্রথমার্ধে আর গোল হয়নি। এক গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের চিত্র বদলে যায়। ৫০ মিনিটে আবারও এম্বোলোর নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। কিন্তু ৬৭ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। রিকার্দো রদ্রিগেসের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ায় বল পেয়ে ডান দিক থেকে সংকীর্ণ কোণেও জোরালো শটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করেন দান এনদোয়ে। মুহূর্তেই ১-১ সমতা। স্তব্ধ হয়ে যায় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের গ্যালারি।
সমতা ফেরার পাঁচ মিনিট পরই ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত। ৭২ মিনিটে বক্সের ভেতরে পড়ে যান ব্রিল এম্বোলো। প্রথমে খেলা চলতে দিলেও পরে ভিডিও সহকারী রেফারির সহায়তায় তাকে অভিনয়ের দায়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন সুইস স্ট্রাইকার। ১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ম্যাচ শেষে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
একজন বেশি খেলোয়াড় নিয়ে শেষ দিকে একের পর এক আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। ৮৯ মিনিটে নিকো গনসালেসের ক্রসে ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। এরপর যোগ করা সময়েও মেসির দূরপাল্লার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ভাগেও সুইজারল্যান্ড প্রাণপণ লড়ে যায়। মনে হচ্ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছে।
কিন্তু ১১২ মিনিটে জ্বলে ওঠেন হুলিয়ান আলভারেজ। মেসির শট গ্রেগর কোবেল ফিরিয়ে দিলেও বল চলে যায় হোসে ম্যানুয়েল লোপেসের কাছে। তিনি বল বাড়িয়ে দেন বক্সের বাইরে থাকা আলভারেজকে। কোনো ভুল না করে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে ডান পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণে। অসাধারণ সেই গোলে ২-১ ব্যবধানে আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

গোল হজমের পর ১০ জনের সুইজারল্যান্ড সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সুযোগেই শেষ আঘাত হানে আর্জেন্টিনা। ১২০+১ মিনিটে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে থিয়াগো আলমাদার শট ঠেকালেও ফিরতি বলে লাওতারো মার্টিনেজ সহজেই জাল খুঁজে নেন। ৩-১। তখনই নিশ্চিত হয়ে যায় আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল।
গোল না পেলেও পুরো ম্যাচে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন লিওনেল মেসি। প্রথম গোলের অ্যাসিস্ট করেন, অতিরিক্ত সময়েও আলভারেজের গোলের সূচনা তার শট থেকেই। ম্যাচজুড়ে সুইজারল্যান্ডের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় নকআউট ম্যাচে কঠিন পরীক্ষা উতরে গেল আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নও আরও এক ধাপ এগিয়ে নিল স্কালোনির দল। এবার তাদের সামনে ইংল্যান্ড। আর বিশ্ব ফুটবল অপেক্ষা করছে আরেকটি মহারণের।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...