২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম আত্মঘাতী গোল থেকে আন্দ্রেস এস্কোবারের ট্র্যাজেডি, ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম ভুলের গল্প
ফিফা বিশ্বকাপ মানেই গোল, উল্লাস, নাটকীয়তা আর ইতিহাস। তবে কখনো কখনো এমন কিছু গোল হয়, যা উদযাপনের বদলে বয়ে আনে হতাশা। নিজের দলের জালে বল জড়িয়ে দেওয়ার সেই মুহূর্তকে ফুটবলের ভাষায় বলা হয় আত্মঘাতী গোল বা ওন গোল। ২০২৬ বিশ্বকাপেরও প্রথম আত্মঘাতী গোলের সাক্ষী হয়েছে ফুটবল বিশ্ব।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘ডি’-এর ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে সপ্তম মিনিটেই এগিয়ে যায় স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। ডান দিক থেকে ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ ও ওয়েস্টন ম্যাককেনির তৈরি করা আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে প্যারাগুয়ের মিডফিল্ডার দামিয়ান ববাদিয়া বল নিজের জালেই পাঠিয়ে দেন। বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের প্রথম আত্মঘাতী গোল হিসেবে নাম লেখায় সেই ঘটনাটি।
প্যারাগুয়ের জন্য এটি ছিল হতাশার শুরু। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ৪-১ গোলে জিতে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর ববাদিয়ার নাম যোগ হয় বিশ্বকাপের দীর্ঘ আত্মঘাতী গোলের তালিকায়।
আত্মঘাতী গোলের ইতিহাস
১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের পর থেকেই আত্মঘাতী গোল ফুটবলের অংশ হয়ে আছে। তবে আধুনিক ফুটবলে দ্রুতগতির আক্রমণ, নিচু ক্রস এবং রক্ষণভাগের ওপর বাড়তি চাপের কারণে এ ধরনের গোলের সংখ্যা বেড়েছে।
বিশেষ করে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের বন্যা দেখা যায়। সেই আসরে মোট ১২টি আত্মঘাতী গোল হয়েছিল, যা একক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ। অনেক ম্যাচের ফল নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এসব গোল।
ফাইনালের ইতিহাসেও আত্মঘাতী গোল
দীর্ঘ ৮৮ বছর বিশ্বকাপ ফাইনালে কোনো আত্মঘাতী গোল দেখা যায়নি। সেই রেকর্ড ভাঙেন ক্রোয়েশিয়ার মারিও মানজুকিচ।
২০১৮ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে আন্তোনিও গ্রিজমানের ফ্রি-কিক থেকে আসা বলে হেড করতে গিয়ে নিজের জালেই বল পাঠান মানজুকিচ। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এটিই প্রথম আত্মঘাতী গোল। পরে তিনি একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে হেরে যায় ক্রোয়েশিয়া।
এক আত্মঘাতী গোল, যা কাঁদিয়েছে বিশ্বকে
বিশ্বকাপ ইতিহাসে আত্মঘাতী গোলের কথা উঠলেই সবার আগে আসে কলম্বিয়ার আন্দ্রেস এস্কোবারের নাম।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ম্যাচে কলম্বিয়া ছিল ফেবারিটদের অন্যতম। কিন্তু ৩৫তম মিনিটে প্রতিপক্ষের একটি নিচু ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজের জালেই বল পাঠিয়ে দেন এস্কোবার। সেই আত্মঘাতী গোলের পর ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে হেরে যায় কলম্বিয়া।
পরাজয়ের ফলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় দক্ষিণ আমেরিকার দলটিকে। কিন্তু ট্র্যাজেডি তখনও বাকি ছিল।
বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফেরার মাত্র কয়েকদিন পর কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের একটি রেস্টুরেন্টের বাইরে সশস্ত্র হামলার শিকার হন এস্কোবার। তাকে ছয়বার গুলি করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্তে উঠে আসে, সে সময় কলম্বিয়ায় ফুটবলকে ঘিরে অবৈধ জুয়া ও অপরাধচক্রের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আত্মঘাতী গোল এবং দলের বিদায়ের সঙ্গে ওই হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। যদিও ঘটনাটির পেছনে একাধিক সামাজিক ও অপরাধমূলক কারণও ছিল।
এস্কোবারের মৃত্যু আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনার একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভুলের পেছনেও থাকে একজন মানুষ
আত্মঘাতী গোল ফুটবলেরই অংশ। একজন ডিফেন্ডার গোল বাঁচাতে গিয়ে ঝুঁকি নেন বলেই অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু আন্দ্রেস এস্কোবারের গল্প বিশ্বকে শিখিয়েছে, মাঠের একটি ভুল কখনোই একজন মানুষের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম আত্মঘাতী গোলটি হয়তো কয়েক বছর পর পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু আত্মঘাতী গোলের ইতিহাসে আন্দ্রেস এস্কোবারের নাম চিরকাল স্মরণ করিয়ে দেবে ফুটবলের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাকে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...