বিশ্বকাপের চমকপ্রদ যা কিছু : জার্মানির কাছে ব্রাজিল ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত
বিশ্বকাপের চমকপ্রদ যা কিছু : জার্মানির কাছে ব্রাজিল ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত
৮ জুলাই, ২০১৪।
বেলো হরিজন্তের এস্তাদিও মিনেইরাও স্টেডিয়ামে তখন উৎসবের আবহ। হলুদ জার্সির ঢেউ, সাম্বার তালে নাচ, হাতে ব্রাজিলের পতাকা। কয়েক ঘণ্টা পর এই একই স্টেডিয়াম পরিণত হবে শোকস্তব্ধ এক জাতির কান্নার মঞ্চে—সেটা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। প্রতিপক্ষ জার্মানি। নেইমার ইনজুরিতে ছিটকে গেছেন, অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা নিষেধাজ্ঞায় বাইরে। তবুও কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ান বিশ্বাস করছিলেন, ঘরের মাঠে ‘সেলেসাও’ আবারও ইতিহাস লিখবে।
কিন্তু ইতিহাস লেখা হয়েছিল ঠিকই, তবে সেটি ছিল অপমান, বিস্ময় আর ফুটবলীয় নিষ্ঠুরতার এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।
ম্যাচের ১১ মিনিটে প্রথম আঘাত হানে জার্মানি। টনি ক্রুসের কর্নার থেকে থমাস মুলারকে একা পেয়ে যায় ব্রাজিলের রক্ষণভাগ। বুক ট্র্যাপ করে নির্ভুল শটে বল জালে পাঠান তিনি। স্টেডিয়াম তখনও নিশ্চুপ হয়নি। সমর্থকরা ভেবেছিলেন, ম্যাচে ফিরতে সময় আছে।
কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সাত মিনিট।
২৩ মিনিট ০৮ সেকেন্ড।
মিরোস্লাভ ক্লোসে গোল করলেন। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৬ গোলের মালিক হলেন তিনি। স্কোরলাইন ২-০।
টেলিভিশনের ক্যামেরা তখন এক নারী সমর্থকের দিকে। মুখে ব্রাজিলের পতাকার রঙ আঁকা। গাল বেয়ে নেমে আসছে একফোঁটা অশ্রু।

২৪ মিনিট।
টনি ক্রুসের বাঁ পায়ের বজ্রগতির শট। গোল। ৩-০।
ক্যামেরা এবার আরেক সমর্থকের দিকে। তিনি হতভম্ব হয়ে পাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন জানতে চাইছেন “এটা কি সত্যিই ঘটছে?”
২৬ মিনিট।
ফার্নান্দিনহোর কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে আবারও গোল করেন ক্রুস। মাত্র ৬৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দ্বিতীয় গোল। স্কোর ৪-০।
মিনেইরাও তখন আর ফুটবল স্টেডিয়াম নয়, যেন এক বিশাল নীরব কবরস্থান।

২৯ মিনিট।
সামি খেদিরা গোল করলেন। স্কোর ৫-০।
মাত্র ৬ মিনিট ৪১ সেকেন্ডে চার গোল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো বড় দলের বিপক্ষে এমন নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ আগে দেখা যায়নি।
গ্যালারিতে তখন কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। কেউ কাঁদছেন। কেউ অবিশ্বাসে ফাঁকা চোখে মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন। আবার কেউ স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন ম্যাচ শেষ হওয়ার অনেক আগেই।
টেলিভিশনের ক্যামেরাগুলো যেন একের পর এক মানবিক ট্র্যাজেডি ধারণ করছিল।
ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজ পরে বলেছিলেন,
“আমি শুধু আমার মানুষগুলোকে একটু আনন্দ দিতে চেয়েছিলাম। তারা অনেক কষ্টে আছে। আমি শুধু তাদের হাসি দেখতে চেয়েছিলাম।”
অন্যদিকে জার্মান বেঞ্চেও বিস্ময়ের কমতি ছিল না।
কোচ ইয়োআখিম লো সহকারী হানসি ফ্লিককে প্রশ্ন করেছিলেন,
“হানসি, আমাকে বলো… এটা কি সত্যিই ঘটছে?”
হাফটাইমে জার্মান ড্রেসিংরুমে আলোচনার বিষয় ছিল আরও গোল নয়, বরং সম্মান।
লো খেলোয়াড়দের সতর্ক করে দিয়েছিলেন, “ব্রাজিলকে অপমান করবে না। তাদের নিয়ে মজা করবে না।”
কারণ তিনি জানতেন, নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ হারানোর যন্ত্রণা কতটা গভীর হতে পারে।
দ্বিতীয়ার্ধেও জার্মানি থামেনি।
বদলি হিসেবে নেমে আন্দ্রে শুরলে করেন আরও দুটি গোল। বিশেষ করে ৭ম গোলটি ছিল চোখ ধাঁধানো। ডান দিক থেকে উঠে এসে প্রায় অসম্ভব কোণ থেকে করা তার শটটি পোস্টে লেগে জালে জড়িয়ে যায়।
স্কোরবোর্ডে তখন লেখা—
ব্রাজিল ০
জার্মানি ৭
গ্যালারিতে কেউ আর ফলাফল দেখছিল না।
তারা দেখছিল এক জাতির স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য।
অতিরিক্ত সময়ে অস্কার একটি গোল শোধ করেন। কিন্তু সেটি ছিল শুধুই সান্ত্বনা।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মিনেইরাও স্টেডিয়ামে নেমে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা।
এটি ছিল ৭৬ বছরে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল হার। ৩৯ বছরে নিজেদের মাঠে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথম পরাজয়। প্রায় এক শতাব্দীতে তাদের সবচেয়ে বড় হার।
১৯৫০ সালের ‘মারাকানাজো’ ছিল হৃদয়ভাঙার গল্প।
২০১৪ সালের ‘মিনেইরাজো’ ছিল হৃদয় চূর্ণ হওয়ার গল্প।

আজও ৭-১ শুধুই একটি স্কোরলাইন নয়।
এটি একটি জাতির কান্না।
একটি স্টেডিয়ামের স্তব্ধতা।
একটি সন্ধ্যার ট্র্যাজেডি।
আর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ, সবচেয়ে অবিশ্বাস্য এবং সবচেয়ে বেদনাদায়ক রাতের নাম।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...