জিকোর ব্রাজিলের সামনে জাপানের ‘জিকোইজম’
চার বছর আগে কাতারে জাপান ছিল দিগন্তে উঁকি দেওয়া সূর্য। সেই আলো দেখে অনেকে বলেছিল শুধু সম্ভাবনার কথা। আজ সেই সূর্য মধ্যগগনে। তার আলোয় বিশ্ব ফুটবলের পুরনো পরাশক্তিরাও ভ্রু কুঁচকে তাকাতে বাধ্য হচ্ছে। ব্রাজিলও জানে, জাপান আর চমকের নাম নয়, সম্মান আর সতর্কতার নাম।
শেষ ৩২-এ মুখোমুখি হওয়ার আগে ব্রাজিলকে সতর্ক করছেন জাপানের পুরনো বন্ধু জিকোও। অনেকের চোখে তিনি যতটা ব্রাজিলিয়ান, ঠিক ততটাই যেন জাপানের। তার কারণও অবশ্য আছে। ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘এই ম্যাচে আমি ব্রাজিলকে সমর্থন করব। কারণ, আমি ব্রাজিলিয়ান। তবে জাপান জিতলে আমার আপত্তি নেই। আমি বুঝতে পারছি, একটা দুর্দান্ত ম্যাচ হবে। কারণ, জাপান এখন ফুটবলটা চমৎকার খেলে।’
সোমবার রাতের এই ম্যাচে তারা দ্বিতীয়বারের মতো মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপে। এর আগে জিকোর হাতে গড়া জাপান প্রথম ম্যাচ খেলেছিল ২০০৬ বিশ্বকাপে, তাতে ৪-১ গোলে জিতেছিল ব্রাজিল। এত বড় হারে সেদিন জিকোর খারাপ লাগারই কথা। ২০ বছর পর আবার দুই দল মুখোমুখি হওয়ার আগে এই ব্রাজিলিয়ান বুঝে ফেলেছেন, জপান ফুটবলের সেই চারাগাছটি ডালপালা মেলে এখন সুগঠিত বৃক্ষ। এই বৃক্ষ তার পরিচয় মেলে ধরেছিল চার বছর আগে, কাতার বিশ্বকাপে জার্মানি ও স্পেনকে হারিয়ে। সুতরাং আপনি ব্রাজিল হলেও সামুরাইয়ের তলোয়ারকে সমীহ করতেই হবে।
জাপানে আধুনিক ফুটবলের মডেল জিকো
মাত্র তিন দশক আগে জাপানে আধুনিক ফুটবলের আলো জ্বালিয়েছিলেন জিকো। এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জাপানে একজন বিদেশি কোচ বা সাবেক ফুটবলার নন, তিনি যেন বটবৃক্ষের প্রথম বীজ, যার ছায়ায় আজ বেড়ে উঠেছে জাপানি ফুটবলের বিশাল অরণ্য। তাই দেশটিতে তাকে অনেকেই শ্রদ্ধাভরে ডাকেন ‘গড অব ফুটবল’।
১৯৯১ সালে, যখন জাপানি ফুটবল পেশাদার যুগের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, তখন জিকোর আগমন কাশিমা অ্যান্টলার্সে। এক বছর পর জন্ম নিল জেলিগ। সেই নবজাতক লিগের প্রথম উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন এই ব্রাজিলিয়ান। তিনি শুধু গোল করেননি, বদলে দিয়েছিলেন একটি দেশের ফুটবল-চিন্তা। ওই সময় জাপানে ফুটবল ছিল, বেসবল আর সুমোর বিশাল ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক কচি চারাগাছ। তার বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন ছিল এমন একজন মানুষের, যিনি শুধু দর্শকই টানবেন না, মানুষের কল্পনাকেও জাগিয়ে তুলবেন। জিকো সেই প্রদীপের প্রথম শিখা হয়ে এসেছিলেন। তার পায়ের জাদু স্টেডিয়ামে দর্শকের ঢল নামিয়েছিল।
কাশিমা শহরের সঙ্গে তৈরি হয় তার আত্মিক বন্ধন। ১৯৯৪ সাল বুট জোড়া তুলে রাখার পর ১০ দিনব্যাপী জিকো-কার্নিভাল করা হয়েছিল। ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন হিসেবে শহরে স্থাপিত হয়, তার দুটি ব্রোঞ্জের মূর্তি। ভালোবাসার কিছুটা ফিরিয়ে দিতে তিনি নিজের ফুটবল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে কাশিমা অ্যান্টলার্সকে পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। খেলোয়াড়দের জিকো বলতেন, ‘দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়ে সন্তুষ্ট থাকা যায়। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখে কেবল চ্যাম্পিয়নদের।’ এই একটি বাক্য যেন কাশিমার ড্রেসিংরুমের দেয়ালে খোদাই করা এক অদৃশ্য মন্ত্র হয়ে ওঠে। খেলোয়াড়দের শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে সেই দর্শন। এটা পরিচিতি পায় ‘জিকোইজম’ নামে।
ব্রাজিলিয়ানের দর্শনে তৈরি জাতীয় দল
২০০২ সালে তিনি জাতীয় দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেন। ২০০৪ সালে জাপানকে এশিয়া কাপ শিরোপা জেতান। ২০০৬ সালে তার দল বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। সেখানে ফল আহামরি কিছু না হলেও সেই প্রজন্মই পরবর্তী এক দশকে জাপানকে এশিয়ার শক্তিশালী ফুটবল পরাশক্তিতে পরিণত করে।
আজকের জাপান আর কারও প্রতিচ্ছবি নয়; তারা যেন বহু নদীর জলের ধারায় তৈরি এক স্বতন্ত্র সমুদ্র। ব্রাজিলের সৃজনশীলতা, জার্মানির মানসিকতা আর জাপানের শৃঙ্খলাবোধ— এই তিন সুর মিলে হয়েছে এক অপূর্ব সিম্ফনি। তাদের ফুটবলারদের পায়ের কারুকাজে সাম্বার ছন্দের ঝলক দেখা যায়, আবার বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই সংগঠিত প্রেসিং, বিদ্যুৎগতির রূপান্তর আর নিখুঁত কৌশলগত শৃঙ্খলায় ফুটে ওঠে আধুনিক ফুটবলের নির্মম সৌন্দর্য। যেন রেশমের কোমলতা আর সামুরাইয়ের তলোয়ার— এক শরীরেই দুই বিপরীত শক্তির সহাবস্থান।
১৯৯৮ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের পর থেকে জাপান কখনোই বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়নি। ধারাবাহিক উন্নতির ফল হচ্ছে, তাদের খেলোয়াড়রা ব্রাজিল ও আমেরিকানদের মতো ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন। স্কোয়াডের ২৬ জনের মধ্যে ২৩ জনই খেলেন ইউরোপে। তাই নিজের দেশের জন্য সতর্কবার্তা দিয়ে রাখছেন জিকো, ‘জাপান কৌশলগত দিক দিয়ে উন্নতি করেছে। তবে তাদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে মানসিকতায়। এখন তারা প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলাতে পারে এবং পিছিয়ে পড়লেও ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস রাখে।’
জিকোইজমে শাণিত জাপান এখন পরাশক্তিগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করে। জিকোর দেশ ব্রাজিলকেও পড়তে হবে সেই চ্যালেঞ্জের মুখে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...