নীরবে গড়া জামায়াতের ‘ছায়া সরকার’, প্রশিক্ষণে সম্ভাব্য মন্ত্রীরা
নীরবে একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুধু গঠনই নয়, সম্ভাব্য ছায়া মন্ত্রীদের প্রশিক্ষণও চলছে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিকল্প নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই কাঠামোর সদস্যদের নাম শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি।
রাজধানীতে নেতার সরকারি বাসভবনে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রথমবারের মতো বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি বলেন, দল ইতোমধ্যে একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। এর সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে। উপযুক্ত সময়েই তাদের নাম প্রকাশ করা হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত মাসে নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই কাঠামো গঠন করা হয়েছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড, বাজেট এবং সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা শুরু করেছেন। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে আলাদা টিম।
জানা গেছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ড. ইলিয়াস মোল্লা, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সাবেক ছাত্রশিবির সভাপতি সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জামায়াত নেতাদের দাবি, ছায়া মন্ত্রিসভার উদ্দেশ্য কেবল সরকারের সমালোচনা করা নয়। বরং সরকারের নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে বিকল্প প্রস্তাব জনগণের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকার পরিচালনার জন্য দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে তোলাও এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, শুরুতে জোটগতভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের চিন্তা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয়ভাবেই এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। এতে কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক ছাত্রনেতাদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ছায়া মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা মনে করেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা একটি স্বীকৃত ধারণা। এটি সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও নীতিগত চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনার সুযোগ দেয়।
তার ভাষায়, সরকার কোনো বাজেট বা গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা ঘোষণা করলে সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীরাও বিকল্প প্রস্তাব দিতে পারেন। এতে জনগণের সামনে তুলনামূলক চিত্র উঠে আসে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে দীর্ঘদিন পর কোনো বড় রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন দেখার বিষয়, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর এই কাঠামো বাস্তবে কতটা সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...