এআই ক্যামেরার চোখে ২৪ ঘণ্টায় ৪৪৯ মামলা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি নজর রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মহাসড়কে চালু হয়েছে এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও ‘অটো ফাইন সিস্টেম’। চালুর প্রথম ২৪ ঘণ্টায়ই আইন অমান্যের ঘটনায় ৪৪৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় জরিমানা ধার্য করা হয়েছে ১৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম। তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হলে মহাসড়কে বেপরোয়া গতি, উল্টো পথে গাড়ি চালানোসহ বিভিন্ন অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪৯০টি জোনে স্থাপন করা হয়েছে ১ হাজার ৪২৭টি অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের গতিবেগ, নম্বর প্লেট এবং বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা হচ্ছে। মেঘনাঘাটে স্থাপিত হাইওয়ে পুলিশের কেন্দ্রীয় কমান্ড, কন্ট্রোল অ্যান্ড মনিটরিং সেন্টার থেকে সার্বক্ষণিকভাবে পুরো ব্যবস্থাটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
কোনো যানবাহন আইন ভঙ্গ করলে ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করা হচ্ছে। পরে বিআরটিএর ডেটাবেজ থেকে গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে তার মোবাইল ফোনে পাঠানো হচ্ছে মামলার তথ্য। জরিমানার অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
প্রথম দিনের মামলাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করাই ছিল সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া অপরাধ। এর পাশাপাশি একমুখী সড়কে উল্টো পথে চলাচল, মহাসড়কের লেনে অবৈধভাবে গাড়ি থামিয়ে রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের ঘটনাও ক্যামেরার নজর এড়ায়নি।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে মহাসড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৪৪৯টি মামলা হওয়া প্রমাণ করে প্রযুক্তিটি কার্যকরভাবে কাজ করছে। এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা পক্ষপাতের সুযোগ নেই। চালকদের মধ্যেও আইন মেনে চলার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, জরিমানা আদায় করা পুলিশের মূল উদ্দেশ্য নয়। মূল লক্ষ্য হলো মহাসড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং দুর্ঘটনা কমিয়ে মানুষের জীবন নিরাপদ করা। পর্যায়ক্রমে এআই ক্যামেরার নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
এদিকে প্রযুক্তির এমন নজরদারিতে চালকদের মধ্যেও সতর্কতা বাড়ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী একটি পরিবহনের চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে অনেক সময় মহাসড়কে পুলিশের উপস্থিতি না থাকলে চালকদের কেউ কেউ গতিসীমা মানতেন না। এখন ক্যামেরার কারণে সেই সুযোগ নেই। ফলে চালকরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন।
কুমিল্লাগামী একটি বাসের চালক জাহিদ হোসেন বলেন, গাড়ির গতি থেকে শুরু করে উল্টো পথে চলাচল পর্যন্ত ক্যামেরায় ধরা পড়ায় চালকদের মধ্যে ভয় নয়, বরং নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত গতির কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে এ ধরনের প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এআইনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর রাখতে হলে বিআরটিএর ডেটাবেজের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। গাড়ির মালিকের মোবাইল নম্বর ও নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য সঠিক না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলার তথ্য পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহারকারী যানবাহন শনাক্তে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দেশের মহাসড়কে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এআই ক্যামেরার নজরদারি নিরবচ্ছিন্ন ও স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলে বেপরোয়া গতি, অবৈধ পার্কিং, উল্টো পথে চলাচল ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং কমানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...