রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:০০ অপরাহ্ন

জন্মদিনে আইয়ুব বাচ্চু

আল আমীন অর্ণব / ৩৬ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

একটি গিটার, কিছু অসম্ভব গান আর বদলে দেওয়া এক প্রজন্মের গল্প

কখনো তিনি গিটার হাতে দাঁড়াতেন মঞ্চের মাঝখানে। চোখ বন্ধ করে আঙুল চালাতেন তারের ওপর। কয়েক মুহূর্ত পরই হাজারো মানুষের কণ্ঠে উঠত গান। কখনো ‘সেই তুমি’, কখনো ‘চলো বদলে যাই’, কখনো ‘রূপালী গিটার’। গান শেষ হলেও থেকে যেত গিটারের দীর্ঘ রেশ।

তিনি আইয়ুব বাচ্চু।

বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে এমন কিছু শিল্পীর নাম আছে, যাদের মৃত্যু হয়, কিন্তু প্রস্থান হয় না। আইয়ুব বাচ্চু সেই তালিকার সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি চলে গেছেন। কিন্তু তার গান, কণ্ঠ আর গিটারের ঝংকার এখনো বাংলাদেশের একাধিক প্রজন্মের সংগীত-স্মৃতির অংশ। ২০২৬ সালে মরণোত্তর একুশে পদক পাওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতেও যেন নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলো তার দীর্ঘ সংগীতযাত্রার গুরুত্ব।

যে ছেলের হাতে উঠেছিল গিটার

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। ডাকনাম ছিল ‘রবিন’। ষাটের দশকের সেই শিশুটি একসময় গিটারকে জীবনের সঙ্গী করে নেবেন, তখন হয়তো কেউ ভাবেনি।

কৈশোরেই গিটারের প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ তৈরি হয়। চট্টগ্রামের ব্যান্ডসংগীতের পরিবেশে তার বেড়ে ওঠা। ১৯৭০-এর দশকে তিনি ‘ফিলিংস’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর ১৯৮০ সালে যোগ দেন ‘সোলস’-এ। প্রায় এক দশক সোলসের সঙ্গে থেকে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন অসাধারণ গিটারবাদক, সুরকার ও সংগীতশিল্পী হিসেবে।

তবে আইয়ুব বাচ্চুর স্বপ্ন ছিল আরও বড়।

এলআরবি: নিজের আকাশ তৈরির গল্প

১৯৯১ সালে তিনি গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড। সেই ব্যান্ডই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে এলআরবি, Love Runs Blind। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় এলআরবির প্রথম ডাবল অ্যালবাম, যা বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এলআরবি শুধু একটি ব্যান্ড ছিল না, ছিল আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতদর্শনের প্রকাশ।

রক, হার্ডরক, ব্লুজ আর বাংলা গানের আবেগকে তিনি নিজের মতো করে মিশিয়েছিলেন। ফলে তার গান একদিকে যেমন তরুণদের উন্মাতাল করত, অন্যদিকে প্রেম, বিচ্ছেদ, একাকিত্ব ও জীবনের নানা অনুভূতিও ছুঁয়ে যেত।

‘সেই তুমি’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘রূপালী গিটার’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘লোকজন কমে গেছে’সহ অসংখ্য গান তাকে পৌঁছে দেয় মানুষের ঘরে ঘরে।

গিটারেই ছিল তার আলাদা পরিচয়

আইয়ুব বাচ্চুকে শুধু গায়ক বললে তার পরিচয়ের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী গিটারবাদক।

তার গিটার বাজানোর ধরন ছিল স্বতন্ত্র। ডিস্টর্টেড গিটারের ব্যবহার, দীর্ঘ গিটার সোলো এবং মঞ্চে গিটারের সঙ্গে তার একাত্মতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক বিশ্লেষণে বাংলাদেশের রকসংগীতে তার অন্যতম বড় অবদান হিসেবে ডিস্টর্টেড গিটারের জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, গিটারবাদক হিসেবে তার ওপর জিমি হেনড্রিক্সের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় সংগীতশিল্পী সাহানা বাজপেয়িও তার গিটার বাজানোর সঙ্গে হেনড্রিক্সের তুলনা করেছিলেন।

এ কারণেই ভক্তদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘গিটার জাদুকর’।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যে শোক

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর আকস্মিক মৃত্যুর খবর শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশের বাইরেও সংবাদ শিরোনাম হয়।

ভারতের India Today তার মৃত্যুকে সামনে রেখে তাকে বাংলাদেশের বিখ্যাত গায়ক, গিটারবাদক ও গীতিকার হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

Times of India লিখেছিল, তার আকস্মিক মৃত্যুতে ভারত ও বাংলাদেশে সংগীতাঙ্গনে শোক নেমে আসে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Voice of America-ও এএফপির প্রতিবেদন প্রকাশ করে তার মৃত্যুর খবর দেয়। প্রতিবেদনের শিরোনামেই উঠে আসে বাংলাদেশের সংগীতপ্রেমীদের শোকের কথা।

অর্থাৎ, আইয়ুব বাচ্চুর সংগীত তখন আর শুধু বাংলাদেশের ভেতরের কোনো গল্প ছিল না। তার মৃত্যুতে সীমান্তের ওপারেও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল শূন্যতা।

শেষ মঞ্চ, তারপর নীরবতা

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মারা যান আইয়ুব বাচ্চু। মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগেও তিনি রংপুরে মঞ্চে গান পরিবেশন করেছিলেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

যে মানুষটি সারাজীবন মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষকে গান শুনিয়েছেন, তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টিও যেন মঞ্চের আলো থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না।

তারপর নেমে আসে নীরবতা।

কিন্তু সেই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি।

কারণ তার গান আবার বাজতে শুরু করে নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টে, গিটার শেখা তরুণের আঙুলে, ব্যান্ডের স্টুডিওতে, ক্যাম্পাসের আড্ডায়, কনসার্টের মঞ্চে।

মৃত্যুর পরও যে উত্তরাধিকার

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার গান নিয়ে নতুন করে আলোচনা হয়েছে বহুবার। তার সন্তানও বাবার গান ও গিটারচর্চার স্মৃতি সামনে এনেছেন। ২০২২ সালে তার ছেলে আহনাফ তাজওয়ার আইয়ুব ‘নীরবে’ গানের গিটার কভার প্রকাশ করে বাবাকে স্মরণ করেছিলেন।

এটাই হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন।

তার গান শুধু পুরোনো প্রজন্ম মনে রাখেনি। নতুন প্রজন্মও তাকে নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করেছে।

এবার রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও

আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এসেছে তার মৃত্যুর প্রায় আট বছর পর।

২০২৬ সালের একুশে পদকের জন্য সংগীত বিভাগে মরণোত্তরভাবে নির্বাচিত হন আইয়ুব বাচ্চু। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার স্ত্রী ফেরদৌস আখতার চন্দনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তার পক্ষে পদক গ্রহণ করেন।

এই স্বীকৃতি যেন তার দীর্ঘ সংগীতযাত্রার আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন।

একুশে পদক পাওয়ার পর তাকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার গানের পাশাপাশি গিটারবাদক হিসেবে তার অসাধারণ দক্ষতা, বাংলা রকসংগীতে তার প্রভাব এবং পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তার ছাপের কথা উঠে এসেছে।

‘সেই তুমি’ থেকে ‘রূপালী গিটার’

আইয়ুব বাচ্চুর গান কেন এত বছর পরও মানুষ শোনে?

সম্ভবত কারণ তার গান শুধু গান ছিল না। সেখানে ছিল মানুষের গল্প।

প্রেম ছিল, অভিমান ছিল। বিচ্ছেদ ছিল, একাকিত্ব ছিল। শহরের ক্লান্তি ছিল। আবার স্বপ্নও ছিল।

তার কণ্ঠে ‘সেই তুমি’ শুনলে এক প্রজন্ম ফিরে যায় তার কৈশোরে। ‘চলো বদলে যাই’ শুনলে মনে পড়ে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা সময়। আর ‘রূপালী গিটার’ যেন হয়ে উঠেছে নিজেই আইয়ুব বাচ্চুর প্রতীক।

একজন শিল্পী তার নিজের তৈরি একটি প্রতীকের সঙ্গে এতটা মিশে যেতে পারেন, আইয়ুব বাচ্চু তার বড় উদাহরণ।

আইয়ুব বাচ্চু নেই, গিটারটি আছে

আজ তার জন্মদিন।

১৬ আগস্ট এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে তার ছবি। কোথাও গলায় গিটার, কোথাও মাইক্রোফোন হাতে, কোথাও চোখ বন্ধ করে গিটার বাজানোর দৃশ্য।

ভক্তরা গান শোনেন।

কেউ ‘সেই তুমি’ চালান। কেউ ‘চলো বদলে যাই’। কেউ আবার পুরোনো এলআরবির অ্যালবাম খুলে বসেন।

তারপর হঠাৎ মনে হয়, মানুষটি নেই।

কিন্তু একজন শিল্পীর প্রকৃত মৃত্যু কি শরীর থেমে যাওয়ার সঙ্গে হয়?

আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রে উত্তরটা সম্ভবত না।

কারণ তার গিটার এখনো বাজে।

তার গান এখনো গাওয়া হয়।

তার সুর এখনো নতুন কোনো তরুণকে গিটার হাতে নিতে উৎসাহ দেয়।

আর সেই কারণেই আইয়ুব বাচ্চু কেবল বাংলাদেশের একজন প্রয়াত রকস্টার নন। তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের এমন এক অধ্যায়, যার শেষ পৃষ্ঠা লেখা হয়নি।

১৬ আগস্ট জন্মদিনে তাই আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হয়তো একটাই, একবার তার গান শোনা, আর একটু জোরে বলা,

‘রূপালী গিটার আজও তোমার কথাই বলে।’

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর