মেসির অজানা গল্প: যে ছেলেটিকে একসময় ‘খুব ছোট’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল
ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসি আজ এক কিংবদন্তির নাম। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ব্যালন ডি’অর কিংবা অসংখ্য গোল- সবকিছু মিলিয়ে তিনি এখন ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম, প্রত্যাখ্যান আর অবিশ্বাস্য কিছু গল্প, যা অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছেই এখনও অজানা।
জন্মের পরই শুরু হয়েছিল সংগ্রাম
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্মগ্রহণ করেন মেসি। মাত্র ১১ বছর বয়সে তার শরীরে ধরা পড়ে ‘গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি’ নামের একটি জটিল সমস্যা। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে শারীরিক বৃদ্ধি হচ্ছিল না।
চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের সাধ্যের বাইরে। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন, ছোটখাটো গড়নের এই ছেলেটি হয়তো কখনো বড় ফুটবলার হতে পারবে না। কিন্তু সেই শিশুই পরে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ডে পরিণত হন।
ন্যাপকিনে লেখা চুক্তি
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত চুক্তিগুলোর একটি হয়েছিল একটি সাধারণ ন্যাপকিনে।
২০০০ সালে স্পেনে ট্রায়াল দিতে যান মেসি। বার্সেলোনার কর্মকর্তারা তার প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হলেও বয়স ও শারীরিক গঠন নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। তখন ক্লাবের ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ একটি রেস্তোরাঁয় বসেই ন্যাপকিন কাগজে লিখে দেন যে বার্সেলোনা মেসিকে দলে নেবে।
আজও সেই ন্যাপকিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
যে কারণে মেসি ডানহাতি নন
অনেকেই জানেন না, মেসি বাম পায়ে খেললেও দৈনন্দিন অনেক কাজ করেন ডান হাতে। তবে মাঠে তার বাম পায়ের নিয়ন্ত্রণ এতটাই নিখুঁত যে অনেক ভক্ত একে ‘ফুটবলের জাদুকাঠি’ বলে থাকেন।
বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও লা লিগায় তার অধিকাংশ স্মরণীয় গোল এসেছে সেই বাম পা থেকেই।
জাতীয় সংগীত গাইতেন না কেন?
ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত চলাকালে মেসিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনাও হয়েছিল।
পরে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জাতীয় সংগীত তার মুখস্থ না থাকলেও দেশের প্রতি ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংগীত গাওয়া শুরু করেন তিনি এবং সমালোচনারও অবসান ঘটে।
স্কুলে ছিলেন খুবই শান্ত স্বভাবের
শৈশবে মেসি ছিলেন লাজুক ও চুপচাপ। সহপাঠীদের সঙ্গে খুব বেশি কথা বলতেন না। বন্ধুদের ভাষায়, তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু ফুটবল নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।
বর্তমানের বিশ্বসেরা তারকাকে দেখে বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন হলেও ছোটবেলার মেসি ছিলেন অত্যন্ত অন্তর্মুখী একজন শিশু।
বার্সেলোনা ছাড়ার দিন কেঁদেছিলেন মেসি
২১ বছরেরও বেশি সময় কাটানোর পর ২০২১ সালে বার্সেলোনা ছাড়তে বাধ্য হন মেসি। বিদায়ী সংবাদ সম্মেলনে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অনেকেই মনে করেন, ব্যালন ডি’অর জেতার মুহূর্তের চেয়েও আবেগঘন ছিল সেই বিদায়ের দৃশ্য। কারণ বার্সেলোনা ছিল তার দ্বিতীয় বাড়ি।
বিশ্বকাপের আগে যে অভিশাপ ছিল
অসাধারণ ক্লাব ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও বহু বছর ধরে মেসিকে শুনতে হয়েছে- “তিনি মারাদোনার মতো নন, কারণ তার বিশ্বকাপ নেই।”
২০১৪ সালের ফাইনালে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয় তাকে ভেঙে দিয়েছিল। এমনকি একবার জাতীয় দল থেকেও অবসর ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেন।
পরিবারই মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি
বিশ্বজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা যাদের, তাদের মধ্যে অন্যতম স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো। শৈশবের বন্ধু আন্তোনেলার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের পর বিয়ে করেন মেসি।
তাদের তিন সন্তান- থিয়াগো, মাতেও ও সিরো। মাঠের বাইরে পরিবারকে ঘিরেই আবর্তিত হয় মেসির ব্যক্তিগত জীবন।
অজানা থেকে কিংবদন্তি
যে ছেলেটিকে একসময় উচ্চতা কম বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যে পরিবারের চিকিৎসার খরচ জোগানোর সামর্থ্য ছিল না, যে কিশোরকে নিয়ে অনেকে সন্দিহান ছিলেন। সেই লিওনেল মেসিই আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ও সম্মানিত খেলোয়াড়।
হয়তো এ কারণেই মেসির গল্প শুধু গোল, ট্রফি কিংবা রেকর্ডের গল্প নয়; এটি স্বপ্ন, সংগ্রাম আর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য উপাখ্যান।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...