কোথাও ঠিকানা স্থায়ী হলো না
কোথাও ঠিকানা স্থায়ী হলো না
-ড. তৈমূর আলম খন্দকার (সিনিয়র অ্যাডভোকেট)
সেনা সমর্থিত ১/১১ সরকার কর্তৃক ১৮/০৪/২০০৭ইং থেকে ১৪/০৫/২০০৯ইং দীর্ঘ কারাবন্দী অবস্থায় লেখা আমার আর্টিকেল মুক্তির পর প্রথম আলো, জনকণ্ঠসহ স্বনামধন্য বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে যাদের সাথে আমার লেখনী সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় নাই। পত্রিকার পলিসি এর কারন ছাড়াও আমার শব্দ সংখ্যা বেশী হওয়াটাও একাটা কারণ। পত্রিকার সম্পাদনায় “ওয়ার্ড ইকোনমি” সম্পর্কে আমার জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। পরবর্তীতে দিনকাল- নয়া দিগন্ত ও ইনকিলাব পত্রিকায় ৮/৯ বছর নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে একটি করে আর্টিকেল প্রকাশিত হতো। কোন সপ্তাহে “লেখা” না পৌঁছালে পত্রিকা থেকেই তাগাদা আসতো। মৃত্যুর পর দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে নিয়ে লেখাই নয়া দিগন্তে প্রকাশিত আমার শেষ লেখা। ২০২২ সালে নারায়নগঞ্জ সিটি মেয়র পদে নির্বাচন করায় দল থেকে বহিস্কার হওয়াটা নয়া দিগন্তের পছন্দ হয় নি বলে মনে হয়েছে, অন্যদিকে এস আলম যে কোন কোন পত্রিকার নিয়ন্ত্রন নিয়েছে তা আমার বোধগম্য ছিল না। দল থেকে বহিস্কারের কারনে দিনকালে স্বয়ংক্রিয় ভাবেই আর্টিকেল পাঠাই নাই। ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে বসুন্ধরার বিরুদ্ধে তথ্য মূলক আর্টিকেল ছাপানো অনেক বড় মাপের পত্রিকা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না, কারন বিজ্ঞাপনের বিষয়টি আর্টিকেলের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়ার কারণও রয়েছে।
ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন, আমার দৃষ্টিতে একজন সৎ মানুষ, সম্পর্ক দীর্ঘ দিনের। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনে জাতীয়বাদী প্যানেলের প্রার্থী হয়ে ২টি নির্বাচন এক সাথে করেছি, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তার বাসায় মিটিং করে আমরা ঐক্যমত হয়ে সিনেট সভায় অংশ নিতাম, কারন শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে সিনেটে আওয়ামীলীগ পন্থীরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। উনার বাসায় রাজকীয় আপ্যায়ন স্মরণ রাখার মত, তার সম্পাদিত “দি নিউ নেশন” পত্রিকায় আইন ও রাজনীীতর উপর আমার বেশ কিছু আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। “Victimonogy: A new concept in Bangladesh” শিরোনামের আর্টিকেলটি নিউ নেশন পত্রিকায় প্রকাশের পর ব্যারিষ্টার সাহেবের ফোনে জিজ্ঞাসা- “কোথায় লেখা পড়া করেছেন” উত্তরে- “ইংরেজী গ্রামার শিখেছি বাবা ও দাদার নিকট থেকে, তবে স্বয়ং সম্পূর্ণ হতে পারি নাই” (উল্লেখ্য স্কুল ও ইন্টার মিডিয়েট জীবনে সারা দিন কোথায় কি করেছি তার ফিরিস্তি ইংরেজীতে লিখে প্রতি রাতে বাবাকে দেখাতে হতো এবং তিনি বিদেশে থাকলে ইংরেজী ভাষায় চিঠি না লিখলে তা তিনি না পড়ে ফেরত পাঠাতেন; পরিবারে সাথে সম্পর্কিত বিষয়টি অনেকেই জানতেন, যার মধ্যে সাংবাদিক হাবিবুর রহমান শ্যামলও রয়েছে)। ড. ইউনুস সরকারের আমলে একটি আর্টিকেল পাঠিয়ে ছিলাম প্রাপ্তি স্বীকারের পরও লেখাটি ছাপা হয় নাই এবং কারণও ব্যাখ্যা করে নাই। এরপর থেকেও ঐ পত্রিকায় আর লেখা পাঠাই নাই। তবে ব্যারিষ্টার মঈনুল হোসেন বেঁচে থাকলে হয়তো বিষয়টি অন্যরকম হতে পারতো। উক্ত আর্টিকেলটি “ল” জার্নাল ডি.এল.আর এবং বি.এল.টি-তে ছাপা হয়েছে। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা- (সব সরকারের মুখ ভরা বুলি) আমার কাছে এখানেই হোঁচট খায় বৈকি! সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গনতন্ত্রের স্বাধীনতা কোথায় কোন রূপে অভিভূত হয় তা আমার চিন্তা চেতনার স্কেলে এখনো ঠাহর করতে পারি না। মঞ্চের বক্তব্য ও বাস্তবতায় ভন্ডামীর শুরু ও শেষ কোথায় তাহাও নিশ্চিত করতে পারি না।
কলেজ জীবনেই শ্রমিক সংগঠনের সাথে জড়িত হওয়ার পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন বস্তিতে বস্তিবাসী শ্রমজীবী ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার (জীবিকার তাগিদে যারা দিনে স্কুলে যেতে পারে নাই) জন্য রাত্রীকালীণ বিদ্যালয় গড়ে তুলি। পর্যায়ক্রমে নদীর উভয় পাড়ে স্কুলের সংখ্যা ১৯টি পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল, যা পরিচালনার জন্য আমারই উদ্দোগ্যে পৌরসভা পাকিস্তান আমলেই বাৎসরিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করতো, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তা অব্যাহত ছিল। তৎসময়ে যুব সমাজ এমর্মে তৎপর হওয়ার কারনেই স্বাধীনতার পর আমার নিরক্ষরতা দূরীকরন আন্দোলন আরো জোরদার হয়। পরবর্তীতে সকল নৈশ বিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পৌর চেয়ারম্যান কে পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান, অধ্যক্ষ খগেন্দ্র নাথ চক্রবর্তীকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও আমাকে সেক্রেটারী করে গঠিত হয়েছিল সরকার অনুমোদিত “কেন্দ্রীয় নিরক্ষরতা দূরীকরন সংস্থা”। পৌর পাঠাগারের (বর্তমান চুনখা নগর পাঠাগার) একটি কক্ষে এর অফিস ছিল। পরবর্তীতে আওয়ামীল লীগ নেতা ও প্রখ্যাত বক্তা নাজিম উদ্দিন মাহমুদ চুনকা ভাইয়ের সাথে কনটেষ্ট করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় সেক্রেটারী পদে দ্বায়িত্ব পালনে অবচেতন মনেই অনীহা চলে আসে। যদিও নাজিম ভাই একজন ভালো মানুষ ছিলেন, তথাপি চুনখা ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্টতার কারনেই আমি নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখি নাই, ফলে ধীরে ধীরে নিরক্ষরতা দূরীকরন আন্দোলন স্থিমিত হয়ে পরে। আর্থিক অনুদানের অভাবে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা রাত্রী কালীন স্কুল গুলি পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। যে ভাবেই হউক দায়িত্বের চেয়ে ইমোশনই এমর্মে আমার নিকট বেশী প্রাধান্য পেয়েছিল; যা আমাকে এখনো পীড়া দেয়। চুনখা ভাইয়ের মৃত্যুও আমার নিকট যথেষ্ট পীড়া দায়ক; মৃত্যুর আগের রাত্রে তার সাথে আমার সর্বশেষ কথা ছিল অনেক ইঙ্গিত পূর্ণ যা আমি তৎসময়ে উপলব্ধি করতে পারি নাই। চুনখা ভাই তৃতীয় নির্বাচনের রেজাল্ট ঘোষনার পূর্বেই হঠাৎ মৃত্যুবরন করেন (গোদনাইল কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত ছিল)। তিনি জোর দিয়েই আমাকে বলতেন, তিনি বেচে থাকাবস্থায় কেহ পৌর চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসতে পারবে না। আমার সাথে তার কোন রাজনৈতিক দলীয় সম্পর্ক ছিল না; আমি তাকে ভাই বলতাম, তিনি আমার মাকে মা ডাকতেন- এইটুকু শুধু জানতাম। স্বাক্ষরতা আন্দোলনের শুরু থেকেই মিডিয়া তথা টিভি ও রেডিওতে জাতিসংঘ ঘোষিত আর্ন্তজাতিক স্বাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে (প্রতি বৎসর ৮ই সেপ্টেম্বর) কথা বলার সুযোগ হয়েছে। স্মরনে আসে, রেডিওতে নিরক্ষরতা দূরীকরন সম্পর্কিত বক্তব্য সমাজকল্যান প্রভাতী সংসদের উদ্দ্যেগে মাজদাইর মসজিদের মাইকে শুনানো হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের আমলে স্বাক্ষরতা আন্দোলন আরো জোরদার হয়- যা ছিল তার ১৯ দফার অন্যতম দফা। স্বাক্ষরতা আন্দোলন সফল করার বিষয়ে আমার লেখা আর্টিকেল পড়ে ডিগ্রি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছে। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে জিয়াউর রহমান সংসদ ভবনের দক্ষিন প্লাজায় দেশব্যাপী যুব প্রতিনিধিদের নিয়ে ২দিন ব্যাপী একটি কর্মশালা করেছিলেন যার মধ্যে বৃক্ষরোপন, মৎস্য চাষ, সমবায় প্রভৃতি সহ স্বাক্ষরতার বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পায়। ঢাকা অতিঃ জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমাম হোসেন (এসময়ের নারায়নগঞ্জের মহকুমা প্রশাসক) উক্ত কর্মশালায় যোগদান ও আমাকে কথা বলার সুযোগ করে দেন।
ঐ সময় (কলেজ জীবনে) দৈনিক বাংলায় আমার আর্টিকেল নিয়মিত প্রকাশ হতো। টাইপিষ্ট দিয়ে টাইপ করে লেখা পত্রিকা অফিসে দিয়ে আসতে হতো। দৈনিক বাংলার তৎকালীন সম্পাদকের ডাকে তার বাস ভবনে (কমলাপুর রেলষ্টেশনের পশ্চিম পাশে অবস্থিত সরকারী অফিসার্স কোয়ার্টার) দেখা করতে যাই, তখন আমাকে দেখে বলেছিলেন- “লেখা পড়ে মনে হয়েছিল তুমি একজন বয়স্ক ব্যক্তি”। পরবর্তীতে আমার লেখাগুলি নিয়মিত দৈনিক সংগ্রাম ও দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায়ও ছাপা হতো।
স্বাধীনতার আন্দোলনের ব্যপক ভূমিকা ছিল বহুল প্রচারিত এমন একটি পত্রিকায় সম্প্রতি বেশ কিছু লেখা ছাঁপানো হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক লুটেরা “এস আলম এর কর্মচারী এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি” এধরনের লেখা এবং হালে সরকারের কট্টর সমালোচনা বা আমি যে
ভাষায় লিখি সে ভাষায় লেখা আর্টিকেল ছাপাতে তারা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। “সংবিধান কি ছেলের হাতে মোয়া” শিরোনামে একটি আর্টিকেল স্বনাধন্য পত্রিকায় পাঠাই, যার শেষ প্যারা ছিল নিম্নরুপ:-
“সংবিধান রক্ষার জন্য স্বৈরাচারের গডফাদার মি: চুন্নুর হাতে শপথ নিয়েই যদি জনাব তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়, তবে বিগত ১৭ বৎসর বি.এন.পি’র সাধারন নেতাকর্মীদের পাট ক্ষেতে রাত্রি যাপন, গুলিতে পঙ্গু, গুম, গায়েবী মামলায় রিমান্ড ও কারাবন্দী নির্যাতিত হওয়া তৃনমূলের নেতা/কর্মীদের এটাই কি ছিল উচিৎ প্রাপ্য? না-কি ক্ষমাই মহত্বের লক্ষন; না-কি আত্মসম্মান দূরে থাক, ক্ষমতায় যাওয়াটাই কি মূল কথা; না-কি রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছুই নাই- না-কি অদৃশ্য শক্তির প্রভাব; বিষয়টি নির্যাতিত নেতাকর্মীরা কোন দৃষ্টিতে বিচার বিশ্লেষন করবে? সংবিধানের দোহাই বাতুলতা মাত্র, ব্যক্তির ইচ্ছায় প্রাধান্য যা ছিল, চলছে এবং চলবে বৈ কি!”
এবং
“বর্তমান রাজনৈতিক হালচালে মনে হয়, সংবিধান যেন “ছেলের হাতে একটি মোয়া, খেলে খেলাম, না খেলে পোষা বিড়ালকে দিয়ে দিলাম”! হৃদয়ের রক্তক্ষরন থেকে আর একটি বিপ্লব হবে কি হবে না- তা ভবিষ্যতই নির্দ্ধারন করবে; যা হতে পারে অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালানোর হাতিয়ার। বৈষম্যবিহীন একটি রাষ্ট্রই জনআকাংখ্যা ও প্রত্যাশা পূরণে একমাত্র সমাধান- যা বাস্তবায়ন এখন সময়ের মূখ্য দাবী।”
চলবে…..








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...