নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হয়ে চলাচল করবে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন
অবশেষে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেল চলাচলের সময় প্রায় দুই ঘণ্টা কমিয়ে আনতে অন্তত ৮০ কিলোমিটার দূরত্ব হ্রাসের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মূলত কুমিল্লায় কর্ড লাইন স্থাপনের মাধ্যমে আখাউড়া-ভৈরব ও টঙ্গী রুট এড়িয়ে কুমিল্লা-লাকসাম-নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হয়ে চলাচল করবে সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেন। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রার সময় কমে দাঁড়াবে প্রায় ৩ ঘণ্টায়।
বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের অভিজাত ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ঘণ্টায় ৬৫ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে চললেও ৩২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে অন্তত সাড়ে ৫ ঘণ্টা। চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলো আখাউড়া-ভৈরব ও টঙ্গী হয়ে ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছায়।
চট্টগ্রামমুখী ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রেও একই রুট ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এই রুটে প্রায় ৮০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে গিয়ে যাত্রীদের বাড়তি প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, দূরত্ব কমে গেলে জ্বালানি সাশ্রয় হবে এবং পরিচালন ব্যয়ও কমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, একজন যাত্রীকে বিমানযোগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে বাসা থেকে বিমানবন্দর, চেক-ইন, ফ্লাইট ও গন্তব্যে পৌঁছানোর পুরো সময় বিবেচনা করলে কর্ড লাইন চালু হলে ব্রডগেজ ট্রেনে তারও আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছানো সম্ভব হবে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীরা কুমিল্লা-লাকসাম হয়ে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া রুট ব্যবহার করবেন। বর্তমানে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেললাইন রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এই লাইন কুমিল্লা ও লাকসামের মধ্যবর্তী অংশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। কর্ড লাইন চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেলওয়ের জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত কর্ড লাইন নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হচ্ছে এবং সেটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সমীক্ষা শেষ হলে ডিপিপি প্রণয়ন করা হবে। এরপর অর্থায়ন নিশ্চিত হলে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।
এর আগে কর্ড লাইন স্থাপনের দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন হলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে বর্তমান সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, চাকরিতে যোগদানের আগেও আমি কর্ড লাইনের কথা শুনেছি, কিন্তু কেউ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার দ্রুত এই কর্ড লাইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ায় ধন্যবাদ জানাই।
কর্ড লাইন প্রকল্পের প্রাথমিক ধাপে গত ১৫ মার্চ ড্রাফট ফিজিবিলিটি রিপোর্ট অনুমোদন করা হয়েছে। বর্তমানে চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে। একই সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করতে পৃথক ডিপিপি প্রস্তুতের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত অ্যালাইনমেন্ট অনুযায়ী সাব-সয়েল ইনভেস্টিগেশন, টপোগ্রাফিক সার্ভে, পরিবেশগত সমীক্ষা, পুনর্বাসন পরিকল্পনা (রিসেটেলমেন্ট প্ল্যান) এবং হাইড্রোমরফোলজিক্যাল স্টাডির কাজও সম্পন্ন হয়েছে। প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ রয়েছে, সেটিকে ভবিষ্যতে ডেডিকেটেড সাইড করিডর হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
সব প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালে রেললাইন নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কুমিল্লার কর্ড লাইন পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে। যাত্রাপথে যানজট এড়াতে রেলপথে একাধিক পৃথক ওভারপাসও নির্মাণ করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ড লাইন চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে রেলযাত্রার সময় প্রায় দুই ঘণ্টা কমে আসবে। এতে সড়কপথে যাত্রী পরিবহনের চাপ যেমন কমবে, তেমনি আকাশপথের যাত্রী পরিবহনেও এর প্রভাব পড়বে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে দ্রুত ও স্বল্পসময়ের যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...