সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৪৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম
সিদ্ধিরগঞ্জে অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার নারায়ণগঞ্জে ভেজালবিরোধী অভিযান ও বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ ডিসির সিদ্ধিরগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলার মামলায় ৪ জনসহ গ্রেপ্তার ৭ রূপগঞ্জে মসজিদ কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০ রাজ্জাক আতঙ্কে ইসদাইর, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা এলাকাবাসীর অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর নারায়ণগঞ্জে আপন ভাইয়ের হাতে বোন ধর্ষণের অভিযোগ সিদ্ধিরগঞ্জে নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ধসে যুবক আহত বাংলাদেশের অর্থনৈতিতে মৎস খাতের ভূমিকা অপরিসীম: এমপি মান্নান ফতুল্লায় বায়ুদূষণকারী ৩টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

রাজ্জাক আতঙ্কে ইসদাইর, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা এলাকাবাসীর

খবর প্রতিদিন রিপোর্ট / ২৭ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬
ইসদাইরের রাজ্জাক বাহিনী

গ্রেপ্তার-জামিনের পর ফের সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ, মাদক ও আধিপত্য বিস্তার ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

স্টাফ রিপোর্টারঃ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইরে মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজ্জাক ও তার সহযোগীদের ঘিরে এলাকায় মাদক কারবার, অস্ত্রের মহড়া, হামলা, সংঘর্ষ ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক অভিযানে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও এলাকায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

এ অবস্থায় ইসদাইরকে মাদক ও সন্ত্রাসের কবল থেকে রক্ষায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। তাদের ভাষ্য, স্থানীয়ভাবে বারবার অভিযোগ ও অভিযান হলেও স্থায়ীভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুর ৩টার দিকে চাষাঢ়া রেলস্টেশনসংলগ্ন পূর্ব ইসদাইরে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে মাদক কারবারিদের সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের দাবি, অভিযানে বাধা দিয়ে হামলা, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যবস্থা নিলে রাজ্জাকের ছেলে জসিম গুলিবিদ্ধ হন। পরে জসিম ও তার সহযোগী মোহনকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

স্থানীয়রা বলছেন, শনিবারের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইসদাইরে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলে আসছে। ছিনতাই, মাদক কারবার, ঝুট ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, হামলা, অপহরণ, খুন ও গোলাগুলির ঘটনায় অতিষ্ঠ এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর দাবি, গত কয়েক বছরে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইসদাইরে অন্তত ৮-৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনায় আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে এসে আবার এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। এতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, “যারা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলবে, তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? অপরাধীরা গ্রেপ্তার হয়, আবার জামিনে বেরিয়ে এসে এলাকায় ফিরে আসে। এরপর আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?”

স্থানীয়দের মতে, ইসদাইরের অপরাধ জগতের অন্যতম নিয়ামক মাদক ব্যবসা। মাদকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই এলাকায় আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়। আর এই নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইসদাইরের কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে নাহিয়ান আজম ইভনের নাম আলোচনায় ছিল। স্থানীয়দের দাবি, তিনি আজমেরী ওসমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একই সময়ে ফারুক বাহিনী নামের একটি গ্রুপও এলাকায় সক্রিয় ছিল। ২০২৫ সালের ৭ নভেম্বর প্রতিপক্ষের হামলায় ইভন নিহত হওয়ার পর তার গ্রুপের তৎপরতা কমে যায়।

এরপর ইসদাইর ও আশপাশের এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে রাজ্জাক ও তার সহযোগীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, রাজ্জাক ও তার পরিবারের সদস্যরা মাদক ব্যবসার পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তার, হামলা, মারামারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে রাজ্জাক কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজ্জাক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযানও হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে ৫৩ রাউন্ড গুলিসহ রাজ্জাক ও তার ছোট ছেলে মো. ওয়াসিমকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়। এর কয়েকদিন আগে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রসহ রাজ্জাকের আরেক ছেলে জসিমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জামিনে মুক্তির পর রাজ্জাক ও তার দুই ছেলে আবারও এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর সঙ্গে বিরোধ তীব্র হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ আগস্ট ইসদাইর রেললাইন এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।

ইসদাইরের ব্যবসায়ী আরিফ রহমান বলেন, “অপরাধীরা বড় ধরনের অপরাধ করেও কোনো সমস্যায় পড়ে না। খুন করে, অস্ত্রসহ আটক হয়ে কিছুদিন পর আবার আরও শক্তিশালী হয়ে জামিনে বের হয়ে আসে।”

তিনি বলেন, এখানে একটি বা দুটি নয়, অসংখ্য সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ না হলে কখনো ইসদাইরে শান্তি আসবে না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর ইসদাইরের অনেক বাসিন্দা প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে চান না। প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, মাদক বিক্রি এবং প্রতিপক্ষের সংঘর্ষের আশঙ্কায় ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ পরিবারগুলোও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেন, ইসদাইরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুতই সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে।

এলাকাবাসীর দাবি, ইসদাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস, অস্ত্রের সরবরাহ, অপরাধী চক্রের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষক এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি তাদের।

তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে ইসদাইরে অপরাধী গ্রুপের নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু অপরাধের চিত্র বদলায়নি। একটি গ্রুপ দুর্বল হলে অন্য গ্রুপ সেই জায়গা দখল করেছে। ফলে মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারের এই চক্র ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘর্ষ ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

ইসদাইরের বাসিন্দারা বলছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হতে চান না। তারা চান নিরাপদ পরিবেশে বসবাস ও ব্যবসা করতে। এ জন্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নজরদারি ও হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

এলাকাবাসীর প্রশ্ন, বারবার গ্রেপ্তার, আবার জামিন, এরপর ফের অপরাধে জড়ানোর এই চক্র আর কতদিন চলবে? রাজ্জাক আতঙ্ক থেকে ইসদাইরবাসীকে মুক্ত করতে এবার কি কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর