অবহেলিত তবু দূর্বার টিপু।
নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে এক দশকের বেশি সময় ধরে যে কয়েকটি নাম নিয়মিতভাবে উচ্চারিত হয়ে আসছে, তাদের মধ্যে অন্যতম এডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি কেবল একজন পদধারী নেতা নন, বরং একজন মাঠকেন্দ্রিক সংগঠক। অনেকেই তাকে রূপক অর্থে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের ভাষ্য, তার ডাকে কর্মসূচিতে উপস্থিতির ঢল নামে, আর সংগঠনের কর্মচাঞ্চল্য যেন নতুন গতি পায়।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় টিপুকে সবসময় সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। দলীয় সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় কিংবা স্থানীয়, যে কোনো কর্মসূচির ঘোষণা এলেই তিনি তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। সমাবেশ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন কিংবা আলোচনা সভা, প্রতিটি আয়োজনেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে নেতা-কর্মীদের মাঠে নামিয়েছেন। অনেক সময় কর্মসূচির আগের রাত পর্যন্ত সমন্বয় করে পরদিন সকাল থেকে নিজেই তদারকিতে থেকেছেন বলে জানান দলের একাধিক নেতা।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে বিএনপির নেতাদের। সে সময় অনেকেই রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও টিপু সংগঠনকে সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন বলে দাবি তৃণমূলের। মামলা, হয়রানি ও রাজনৈতিক চাপে অনেকের উপস্থিতি কমে গেলেও তাকে মাঠে দেখা গেছে নিয়মিত। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, সংগঠনের ভাঙন ঠেকানো এবং নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করার চেষ্টা ছিল তার রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন ঘনিষ্ঠরা।
গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নানা নাটকীয়তা তৈরি হয়। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে টিপুর নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় আসে। তৃণমূলের বড় একটি অংশ তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়ন পাননি। এতে তার সমর্থকদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তবে টিপু প্রকাশ্যে কোনো ক্ষোভ দেখাননি। দলীয় সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি চুপচাপ সংগঠনের কাজেই মন দেন।
কেন্দ্র থেকে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামানকে মনোনয়ন দেওয়া হলে শুরু থেকেই তার পক্ষে মাঠে সক্রিয় হন টিপু। বিভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিট পর্যায়ে বৈঠক করে কর্মীদের সংগঠিত করেন। পরবর্তীতে মনোনয়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলে একসময় সাখাওয়াত হোসেন খানের নাম শোনা যায়। কিন্তু চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন পান আবুল কালাম। প্রতিবারই প্রার্থীর নাম পরিবর্তনের পর নতুন করে মাঠে নেমেছেন টিপু। ব্যক্তিগত কষ্ট থাকলেও সেটিকে সামনে আনেননি বলে দাবি তার সহকর্মীদের।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাকে সদর ও বন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে। পাড়া-মহল্লায় ছোট ছোট পথসভা, গণসংযোগ এবং কর্মীসভায় অংশ নিয়ে তিনি প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। অনেকেই বলেন, তিনি যেন নিজেই প্রার্থী, এমন আন্তরিকতায় কাজ করেছেন। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল আসনটি দলকে উপহার দেওয়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা।
নির্বাচনে সাফল্য আসার পর দলীয় অঙ্গনে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে তৃণমূলের একটি অংশ মনে করছে, টিপুর অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়নি। তাদের অভিযোগ, যারা নিয়মিত মাঠে সক্রিয় নন কিংবা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকেন, তারাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন। এতে কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যিনি সংগঠনের হাল ধরে রেখেছেন, তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করেন, টিপুর রাজনৈতিক জীবন মূলত সংগ্রাম ও অপেক্ষার গল্প। বারবার সম্ভাবনার তালিকায় থেকেও শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে পড়া, প্রত্যাশা তৈরি হয়ে তা পূরণ না হওয়া, এসব অভিজ্ঞতা তার জন্য নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবারই তিনি নিজেকে গুটিয়ে না নিয়ে নতুন উদ্যমে মাঠে ফিরেছেন। এই ধারাবাহিকতাই তাকে আলাদা করেছে বলে মন্তব্য করেন এক সিনিয়র নেতা।
তৃণমূল পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম কারণ ব্যক্তিগত যোগাযোগ। বিভিন্ন ওয়ার্ডের ছোট নেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো এবং রাজনৈতিক সংকটে সহযোগিতা করা তাকে সংগঠনের ভরসার জায়গায় পরিণত করেছে। কর্মীরা মনে করেন, তিনি কেবল নির্দেশদাতা নন, বরং সহযোদ্ধা।
এখন দলের ভেতরে আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতে তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কর্মীদের একটি অংশের দাবি, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তাদের যুক্তি, জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের জন্য একজন সংগঠক ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। টিপু সেই দায়িত্ব পালনে সক্ষম বলে তারা বিশ্বাস করেন।
অবশ্য দলীয় সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই নেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ভেতরে টিপুকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা সহজ হবে না। দীর্ঘদিনের মাঠকেন্দ্রিক রাজনীতি, দুঃসময়ে সক্রিয় উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত অভিমানকে চাপা রেখে সংগঠনের স্বার্থে কাজ করে যাওয়ার কারণে তিনি তৃণমূলের একটি বড় অংশের আস্থা অর্জন করেছেন।
রাজনীতিতে মূল্যায়ন সবসময় তাৎক্ষণিক হয় না। অনেক সময় সময়ের অপেক্ষা করতে হয়। অবহেলার অভিযোগ থাকলেও টিপু থেমে থাকেননি। বরং প্রতিটি নতুন কর্মসূচিতে নিজেকে নতুন করে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। তাই মহানগর বিএনপির অনেকের চোখে তিনি এখনো দূর্বার, এখনো সক্রিয়, এখনো সংগঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ কান্ডারি। ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত যাই হোক, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা যে আরও দীর্ঘদিন চলবে, তা বলাই যায়।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...