শহীদ মিনারের মর্যাদা ফেরাতে তনুর পোস্টে নগরজুড়ে আলোচনা
প্রশাসনের নীরবতায় প্রশ্ন, হকারমুক্ত করার দাবি জোরালো
একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পরিবেশ ও মর্যাদা। ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত এ স্থাপনার চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে হকারদের দখল, জনদুর্ভোগ এবং স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন আহ্বান জানিয়েছেন সুন্দর নারায়ণগঞ্জ গড়ার অন্যতম উদ্যোক্তা, নারায়ণগঞ্জ চেম্বারের পরিচালক এবং ‘উই আর ভলান্টিয়ার্স নারায়ণগঞ্জ’-এর প্রতিষ্ঠাতা আহমেদুর রহমান তনু। তার ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। একই সঙ্গে শহীদ মিনার এলাকা অবিলম্বে হকারমুক্ত করার দাবিও জোরালো হয়েছে।
মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া পোস্টে আহমেদুর রহমান তনু লিখেন, “ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ বা শহীদ মিনার, বাঙালি জাতির ভাষার অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক সংগ্রামের প্রতীক। নিজের মায়ের ভাষার সম্মানের জন্য হলেও নারায়ণগঞ্জ শহীদ মিনারকে তার মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। শহীদ মিনারকে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়ার জন্য শুধু আন্তরিকতা ও ইচ্ছা প্রয়োজন।”
অল্প কথার ওই পোস্টটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পোস্টটি শেয়ার করে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অনেকেই মন্তব্য করেন, একটি জাতীয় স্মৃতিচিহ্নের চারপাশে এমন অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের মধ্যেই কীভাবে বছরের পর বছর শহীদ মিনারের আশপাশ দখল হয়ে থাকে।
পোস্টে তনু জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীব এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের রাজনৈতিক সচিব আবুল কাউসার আশার দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছেন হকাররা। কোথাও ফুচকা, কোথাও মোমো, কোথাও খেলনা ও মেলার সামগ্রী, আবার কোথাও প্রসাধনী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজানো। ক্রেতাদের ভিড় এবং দোকানিদের হাঁকডাকে অনেক সময় শহীদ মিনারের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। দর্শনার্থীদের চলাচলেও সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।
নগরবাসীর অভিযোগ, ফুটপাত দখলের সমস্যা এখন শহীদ মিনারের পবিত্র এলাকাতেও পৌঁছে গেছে। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি যদি দখলমুক্ত রাখা না যায়, তবে ধীরে ধীরে এর সৌন্দর্য ও মর্যাদা দুটোই নষ্ট হয়ে যাবে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, শহীদ মিনার শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ, বাঙালির চেতনা এবং জাতীয় গৌরবের প্রতীক। তাই এর আশপাশে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বা অবৈধ দখলদারিত্ব গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তারা বলছেন, হকারদের জীবিকার বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তবে সেই সমাধানের জন্য জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভকে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া যায় না।
তনুর পোস্টের পর প্রশাসনের ভূমিকাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নাগরিকদের ভাষ্য, দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিয়মিত এই এলাকা দিয়ে চলাচল করলেও দীর্ঘদিন ধরে শহীদ মিনারের চারপাশের এমন চিত্র বহাল রয়েছে। কেন এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তারও জবাব জানতে চান তারা।
নগরবাসীর দাবি, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের চারপাশ অবিলম্বে স্থায়ীভাবে হকারমুক্ত ঘোষণা করতে হবে। নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি শহীদ মিনার ঘিরে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এই স্থানটি তার প্রকৃত সম্মান ফিরে পায়।
একটি ফেসবুক পোস্ট হয়তো সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে না। তবে সেই পোস্ট যদি একটি শহরের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেটি আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি লেখা থাকে না, হয়ে ওঠে জনমতের প্রতিধ্বনি। আহমেদুর রহমান তনুর এই আহ্বানও এখন তেমনই এক নাগরিক দাবিতে রূপ নিয়েছে। সেই দাবির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে সাড়া দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে নারায়ণগঞ্জবাসী।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...