সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৩২ পূর্বাহ্ন

মেসি অপ্রতিরোধ্য, তবু পেনাল্টিতে প্রশ্ন

আল আমীন অর্ণব / ৭ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বকাপে তিনি যেন ইতিহাস লেখার কারিগর। একের পর এক রেকর্ড, দুর্দান্ত গোল, ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। ২০২৬ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি আবারও প্রমাণ করছেন কেন তাকে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা বলা হয়। কিন্তু এই উজ্জ্বল অভিযানের মাঝেও আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়িয়েছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন। স্বাভাবিক সময়ে পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব কি এখনও মেসির হাতেই থাকা উচিত?

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ম্যাচটি সেই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়া আর্জেন্টিনা যখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে, তখনই জেগে ওঠেন মেসি। একটি গোল করেন, আরেকটি গোলে অবদান রাখেন। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফিফার ম্যাচ প্রতিবেদনেও মেসির নেতৃত্ব এবং আর্জেন্টিনার নাটকীয় প্রত্যাবর্তনকে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ম্যাচেই আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক কীর্তি নিজের করে নেন মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল ও অ্যাসিস্টের যৌথ অবদান রাখা খেলোয়াড়দের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। দিয়েগো ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপে সর্বাধিক অ্যাসিস্টদাতার আসনেও এককভাবে উঠে আসেন তিনি। একই সঙ্গে নকআউট পর্বে তার গোলসংখ্যাও আরও সমৃদ্ধ হয়। ফিফার পরিসংখ্যানেও এসব রেকর্ডের স্বীকৃতি রয়েছে।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে একটি মিস করা পেনাল্টি।

ম্যাচের শুরুতে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। ব্যবধান কমানোর সুবর্ণ সুযোগ ছিল সেটি। কিন্তু মেসির নেওয়া শট সহজেই ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। ভাগ্য ভালো, শেষ পর্যন্ত সেই মিস আর্জেন্টিনার বিদায়ের কারণ হয়নি।

কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

২০২৬ বিশ্বকাপে এর আগে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি। অর্থাৎ একই বিশ্বকাপে নির্ধারিত সময়ে দুটি পেনাল্টি মিস করলেন তিনি। বিশ্বকাপে শুটআউট বাদ দিলে এখন পর্যন্ত আটটি পেনাল্টি নিয়ে গোল করতে পেরেছেন মাত্র চারটিতে।

ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে চিত্রটিও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। অপটার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুটআউট বাদ দিলে মেসি ১৪৮টি পেনাল্টির মধ্যে ১১৪টিতে সফল। সফলতার হার প্রায় ৭৭ শতাংশ। অথচ আধুনিক ফুটবলের সেরা পেনাল্টি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হ্যারি কেইনের সফলতার হার ৯০ শতাংশের বেশি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ৮৫ শতাংশের বেশি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের ৮১ শতাংশের কাছাকাছি।

অদ্ভুত বিষয় হলো, ওপেন প্লেতে মেসির দক্ষতা ঠিক উল্টো ছবি তুলে ধরে। কঠিনতম পরিস্থিতিতেও তিনি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গোল করেন। বিশ্বকাপে পেনাল্টি ছাড়া তার গোলের সংখ্যা প্রত্যাশিত গোলের হিসাবকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ চলমান খেলায় তিনি অসাধারণ, কিন্তু ১২ গজ দূরের স্থির বল থেকেই তুলনামূলক বেশি ভুল করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে মেসির নিজস্ব কৌশল। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোলরক্ষকের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করেন। গোলরক্ষক আগে ঝাঁপ দিলে বিপরীত কোণে বল পাঠানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে ভিডিও বিশ্লেষণ, তথ্যভাণ্ডার এবং প্রতিপক্ষের প্রস্তুতি এতটাই উন্নত হয়েছে যে, এই কৌশল আগের মতো কার্যকর থাকছে না।

তাহলে কি আর্জেন্টিনার পেনাল্টি টেকার বদলানো উচিত?

তত্ত্বে উত্তরটি সহজ হলেও বাস্তবে বিষয়টি অনেক কঠিন। কারণ যার কথা বলা হচ্ছে, তিনি লিওনেল মেসি।

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন পর্যন্ত বলেছেন, মেসির পেনাল্টি নিয়ে এখন আর তার আগের মতো আত্মবিশ্বাস নেই। তবে ইয়ান রাইট মনে করেন, ড্রেসিংরুমে দাঁড়িয়ে মেসিকে কেউ বলবে, ‘আজ পেনাল্টি আমি নেব’, এমন সাহস দেখানো খুবই কঠিন।

আর্জেন্টিনার অবশ্য বিকল্পের অভাব নেই। লিয়ান্দ্রো পারেদেস, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ কিংবা হুলিয়ান আলভারেজ, সবারই পেনাল্টি রেকর্ড অত্যন্ত ভালো।

তবু কোচ লিওনেল স্কালোনির অবস্থান পরিষ্কার।

কোয়ার্টার ফাইনালের আগে তিনি বলেছেন, ‘লিও যদি পেনাল্টি নিতে চায়, তাহলে সে-ই নেবে। আমাদের দলে আরও ভালো পেনাল্টি টেকার আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত তারই।’

এই আস্থার পেছনেও যুক্তি আছে। ২০২২ বিশ্বকাপে সাতটি পেনাল্টির মধ্যে ছয়টিতে গোল করেছিলেন মেসি। নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের বিপক্ষে শুটআউটেও প্রথম কিক নিয়ে গোল করে দলকে শিরোপার পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন।

এবারের বিশ্বকাপ অবশ্য ভিন্ন গল্প বলছে। রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ছেন তিনি। মাঠে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলকে সেমিফাইনালে তুলেছেন। কিন্তু পেনাল্টি স্পটে এসে যেন সেই অদম্য মেসিকেও মাঝে মাঝে মানবিক মনে হচ্ছে।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে হয়তো তিনিই সর্বকালের সেরাদের একজন। কিন্তু ১২ গজ দূরের সেই ছোট্ট বিন্দুটি এখনও তার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা।

সেমিফাইনাল সামনে। নকআউটের প্রতিটি মুহূর্তই এখন জীবন-মরণের লড়াই। তাই প্রশ্নটা আর আবেগের নয়, কৌশলের।

মেসি কি পেনাল্টি নেবেন? নাকি আর্জেন্টিনা সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সাহস দেখাবে?

এই বিতর্কের উত্তর মিলবে মাঠেই।

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর