শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন

অন্ধকারে বন্দরের জনজীবন অর্ধেক বিদ্যুৎ, দ্বিগুণ দুর্ভোগ

খবর প্রতিদিন রিপোর্ট / ৬৭ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলায় বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিন-রাত মিলিয়ে কয়েক দফা বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন বন্দরের মানুষের নিত্যসঙ্গী। সামান্য বাতাস কিংবা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ। উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে শিল্প-কারখানায়, ক্ষতির মুখে পড়ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা।

বুধবার (২৪ জুন) বন্দর উপজেলায় দিনের অধিকাংশ সময়ই ছিল বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরবর্তী দুই ঘণ্টা চলে গেছে লোডশেডিংয়ে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। দিনের পাশাপাশি রাতেও কয়েক দফা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ঘুমহীন রাত কাটাতে হয়েছে হাজারো পরিবারকে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দোকানপাট, ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজের গতি মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অনেক দোকানে জেনারেটর চালিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। তবে বাড়তি জ্বালানি খরচ বহন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। অনেক এলাকায় সাবমার্সিবল পাম্প বন্ধ থাকায় প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, গত কয়েক মাস ধরেই বন্দরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অজুহাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে। কখনো লোডশেডিং, কখনো কারিগরি ত্রুটি, আবার কখনো লাইনের সমস্যার কথা বলা হয়। কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না। ফলে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে দিন দিন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বন্দরে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। গ্রাহকদের অভিযোগ, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদাসীনতা, অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতাও একটি বড় কারণ। তাদের মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর তদারকি থাকলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।

সরকারি হাজী ইব্রাহিম আলম চাঁন মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বাদল বলেন, “দিন-রাতে কয়েক দফায় বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে নাগরিক জীবন প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সবকিছুই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে দিনের পর দিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

বন্দরের মদনপুর এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তার দোকানের ফ্রিজ ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই অভিযোগ করেছেন কলাগাছিয়া, ধামগড়, বন্দর সদর ও নবীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দারাও। তাদের দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

এদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা ও বিভিন্ন ডিজিটাল কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

সব অভিযোগের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বন্দর জোনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোকশেদুল ইসলাম বলেন, “আগের তুলনায় বর্তমানে আমরা প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছি। এ কারণে দিনের বেশির ভাগ সময় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। মূলত গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়লে বিদ্যুতের পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।”

তবে তার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগীরা। তাদের প্রশ্ন, যদি উৎপাদন সংকটই মূল কারণ হয়, তাহলে আগে থেকেই গ্রাহকদের অবহিত করা হচ্ছে না কেন? কেন কোনো নির্ধারিত লোডশেডিং সূচি প্রকাশ করা হচ্ছে না? হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মপরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে বলে অভিযোগ তাদের।

নাগরিকদের দাবি, দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য সময়সূচি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় বন্দরের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্দরের মানুষের একটাই প্রশ্ন দেশে উন্নয়নের নানা সূচকের কথা বলা হলেও কেন এখনো বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা নিয়ে এমন চরম অনিশ্চয়তায় থাকতে হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন লাখো গ্রাহক, যারা প্রতিদিন অন্ধকারে বসে বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষা করছেন।

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর