চেকার ফারুকের নেতৃত্বে গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে ফের তেল চোর সিন্ডিকেট সক্রিয়!
নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে ফের তেল চোর সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত চেকার ফারুকের নেতৃত্বে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রবি ওরফে ‘মাইগ্যা রবিকে’ সামনে রেখে ডিপোতে তেল চুরির চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফারুক আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে ঢাকায় বদলি করা হলেও সম্প্রতি আবারও গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে ফিরেছেন তিনি। বিভিন্ন অভিযোগের পর তাকে পানির পাম্পে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেখান থেকেই মোবাইল ফোনে রবি ওরফে মাইগ্যা রবির মাধ্যমে ডিপোর বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
তাদের ভাষ্য, ফারুক ডিপোতে দায়িত্বে থাকাকালে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে রবি বিভিন্ন পয়েন্টে প্রভাব বিস্তার করেন। বর্তমানে ফারুকের দায়িত্ব পরিবর্তন হলেও রবি ডিপোতে বহাল রয়েছেন। তেল চোর সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি রবি দেখভাল করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে ডিপোর অনেকেই তাকে ‘ক্যাশিয়ার রবি’ নামে চেনেন বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর এলাকার লোক হওয়ায় সুপারিশের মাধ্যমে রবি গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে চাকরি পান। এরপর ফারুকের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ডিপোর বিভিন্ন পয়েন্টে নিজের প্রভাব তৈরি করেন। সরকার পতনের পর ফারুক বদলি হলেও রবি বহাল থাকেন। বর্তমানে ডিপোর বিভিন্ন পয়েন্টে তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোন ট্যাংকলরিতে কী পরিমাণ তেল যাবে, সে বিষয়েও রবি প্রভাব বিস্তার করেন। ডিপোর তেল চোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও দাবি তাদের। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রবির জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, ক্যাজুয়েল স্টাফ হিসেবে কর্মরত রবির মাসিক বেতন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টাকা হলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মঞ্জিল ভিলায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন তিনি। কেরানীগঞ্জে তার কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে বলেও বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে। একজন ক্যাজুয়েল কর্মচারীর এমন জীবনযাপনের অর্থের উৎস কী, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে সম্পত্তি ও আয়ের বিষয়ে এসব দাবির স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, রবি ডিপোতে বহাল থাকলে ফারুককে পানির পাম্পে দায়িত্ব দিয়েও তেল চোর সিন্ডিকেট বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাদের মতে, ফারুকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
ফারুকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিপোতে তেল চুরির অভিযোগ ওঠার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, তেল চুরির অভিযোগ নিয়ে তালাশ টিভির ৩৫৮ নম্বর পর্বে তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয় বলেও দাবি করেন তারা। তবে ওই প্রতিবেদনের তথ্য ও বদলির কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকায় বদলি হওয়ার পরও ফারুক তার ঘনিষ্ঠ রবি ও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর মাধ্যমে গোদনাইল ডিপোর তেল চোর সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। তেল চুরির অর্থ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে ভাগাভাগি হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো আর্থিক নথি বা স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে কয়েকজন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতার অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ফারুক কীভাবে আবার গোদনাইল পদ্মা ডিপোতে ফিরলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের দাবি, ফারুকের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে প্রশাসনের মাধ্যমে হুমকি ও হয়রানির ভয় দেখানো হয়। ফলে অনেকে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, জেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতা এবং সাবেক এক ছাত্রনেতাকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ফারুক ডিপোতে নিজের প্রভাব ধরে রেখেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার অভিযোগ, ফারুক প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন যে স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের সুপারিশে তিনি ঢাকায় থেকে আবার পদ্মা ডিপোতে ফিরেছেন। সংসদ সদস্যের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ফারুকের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ ও যাত্রাবাড়ী থানায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট একাধিক মামলা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। মামলাগুলো তদন্তাধীন এবং অর্থের বিনিময়ে সেগুলো থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট থানার নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
গোদনাইলের বৈধ ব্যবসায়ীদের দাবি, পদ্মা ডিপোকে কেন্দ্র করে তেল চুরি ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। ডিপোর তেল গ্রহণ, সংরক্ষণ, উত্তোলন ও পরিবহনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সম্পদ রক্ষায় উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা বলেন, অতীতে যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল, তারা কীভাবে আবার ডিপোর গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। সরকারি তেল সম্পদ রক্ষা এবং ডিপোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
চেকার ফারুক ও রবি ওরফে মাইগ্যা রবির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...