শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:২২ পূর্বাহ্ন

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত তানিয়া হত্যার রহস্য ১৫ দিনেই উদঘাটন, স্বামী গ্রেপ্তার

খবর প্রতিদিন রিপোর্ট / ১৫ বার পঠিত
প্রকাশিত সময় : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
গ্রেপ্তারকৃত সোহাগ মিয়া জুলহাস (৩৩)

সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে ঝগড়ার একপর্যায়ে স্ত্রী তানিয়া আক্তারকে গলা চেপে শ্বাসরোধে হত্যা করেন স্বামী সোহাগ মিয়া জুলহাস। হত্যার পর স্ত্রীর নাকের স্বর্ণের নাকফুল খুলে নিয়ে ঘরে তালা দিয়ে পালিয়ে যান তিনি। হত্যাকাণ্ডের ১৫ দিনের মাথায় প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

মঙ্গলবার (১১ আগষ্ট) সকালে নারায়ণগঞ্জের পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ।

গ্রেপ্তারকৃত সোহাগ মিয়া জুলহাস (৩৩) গাইবান্ধা সদর থানার পূর্ব কোমরজানি (ডাক্তার বাড়ি) এলাকার মো. সেকান্দার আলীর ছেলে। সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি পশ্চিমপাড়া মাতবর বাড়ি এলাকায় ভাড়া থাকতেন তিনি।

পিবিআই জানায়, গত ২৫ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১টার মধ্যে সংসারের অভাব-অনটন ও আর্থিক বিষয় নিয়ে তানিয়া ও সোহাগের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে সোহাগ তানিয়ার গলা চেপে ধরলে শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়।

পরদিন সকালে তানিয়ার মরদেহ ঘরের ভেতর রেখেই তার নাকে থাকা স্বর্ণের নাকফুল খুলে নেন সোহাগ। পরে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে চাবি তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তারের কাছে দিয়ে চলে যান। এরপর নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

পিবিআইয়ের তথ্যমতে, গত ২৬ জুলাই সকালে সোহাগ তার স্ত্রী তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তারের বাসায় গিয়ে ঘরের চাবি দিয়ে বলেন, তানিয়া গার্মেন্টসে গেছেন। গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং তাকে ছুটি দেওয়া হবে। দুপুরে যেন নাছিমা চাবি নিয়ে তাদের বাসায় যান, এমন কথাও বলে চলে যান সোহাগ।

পরে নাছিমা তানিয়ার কর্মস্থলে গিয়ে জানতে পারেন, সেদিন তানিয়া গার্মেন্টসে যাননি। এতে সন্দেহ হলে তিনি তানিয়ার বাসায় যান। সেখানে বাইরে থেকে দরজায় তালা দেখতে পান। বাড়ির মালিকের ছেলের স্ত্রী শ্রাবন্তীকে সঙ্গে নিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন তারা।

ঘরের মশারির ভেতরে তানিয়াকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে মশারি সরিয়ে নাছিমা তার নাক-মুখে রক্ত দেখতে পান। শরীর শক্ত হয়ে যাওয়ায় তিনি চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এ ঘটনায় তানিয়ার খালা নাছিমা আক্তার বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে তানিয়া ও সোহাগের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে পরিবারের অমতে তারা বিয়ে করেন। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের সংসারে কলহ চলছিল। সোহাগের স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থান ছিল না। সংসারের অভাব-অনটন ও আর্থিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। এমনকি তানিয়াকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে বলে তদন্তে তথ্য পায় পিবিআই।

মামলাটি পিবিআইয়ের সিডিউলভুক্ত হওয়ার পর গত ১০ আগস্ট সংস্থাটি স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা করা হয় এসআই মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে।

পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর সোহাগ মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যান। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রথমে ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে মেরাদিয়া ও ছোবাহানবাগ এলাকায় তার অবস্থানের তথ্য পাওয়া যায়। এসব এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোহাগের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। মঙ্গলবার ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে গাইবান্ধা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী একটি দূরপাল্লার বাসে তল্লাশি চালিয়ে ফতুল্লার সাইনবোর্ড এলাকার চৌরঙ্গী ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

পিবিআই আরও জানায়, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহাগ তানিয়া হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে মঙ্গলবার তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি।

পিবিআই নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তদন্তের মাধ্যমে তানিয়া হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...


এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..
এক ক্লিকে বিভাগের খবর