বর্ষা সামনে, ডেঙ্গু আতঙ্কে নারায়ণগঞ্জ আগাম প্রস্তুতি না থাকলে ভয়াবহতার শঙ্কা
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আবারও ডেঙ্গু নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে নারায়ণগঞ্জে। প্রতি বছরের মতো এবারও এডিস মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে গত বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও হাসপাতালগুলোর নাজুক পরিস্থিতি এখনো মানুষের মনে আতঙ্ক জাগিয়ে রাখছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই কার্যকর প্রস্তুতি না নিলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মৌসুমি উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ।
গত বর্ষা মৌসুমে নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি, অপরিষ্কার ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে এডিস মশার বংশবিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তখন অনেক পরিবারেই একাধিক সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। হাসপাতালে সিট সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চাপে ফেলে দেয়। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছে যা নগরীর স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।
ডেঙ্গু বাড়ার সময় প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধিরা ফগার মেশিন নিয়ে এলাকায় নামছেন। এসব কার্যক্রমের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমানতা নির্ভর।
নগরীর নিতাইগঞ্জ, খানপুর, চাষাঢ়া, বাবুরাইল, বন্দর, ফতুল্লা, কুতুবপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ফগিং কার্যক্রম নিয়মিত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পনাহীনভাবে পরিচালিত হয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য মশা কমলেও অল্প দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফগিং মূলত উড়ন্ত মশা কিছুটা কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু মশার লার্ভা ধ্বংস করতে পারে না। ফলে উৎসস্থল অক্ষত থাকলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই ফগিংয়ের পাশাপাশি মশার বংশবিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গুর সময় নারায়ণগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতাল এবং ৩০০ শয্যার খানপুর হাসপাতাল রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খায়। পর্যাপ্ত শয্যার অভাবে অনেক গুরুতর রোগীকেও ভর্তি করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হঠাৎ করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে বিদ্যমান অবকাঠামো দিয়ে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বর্ষার আগেই অতিরিক্ত শয্যা প্রস্তুত রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম মজুদ করা এবং জনবল বাড়ানো জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা। এজন্য বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানির উৎসগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, পানির ট্যাংক, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ কিংবা যেকোনো স্থানে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা জরুরি। পাশাপাশি নগরজুড়ে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাদের নজর রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলমান।
সিটি করপোরেশনের নতুন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান দায়িত্ব নেওয়ার পরই ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি তার প্রথম ৬০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় মশা নিধন কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি নিয়মিত ফগিং ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানোর কথাও বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মৌসুমি বা তাৎক্ষণিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বরং সারা বছরব্যাপী একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি, নিয়মিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাও গড়ে তোলা দরকার।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবার আগেভাগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। শুধু দৃশ্যমান কার্যক্রম নয়, বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো হবে এমনটাই চান নগরবাসী।
স্থানীয়রা বলছেন, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে গত বছরের মতো প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। তাই রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে গিয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সব মিলিয়ে, বর্ষা সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি যে কোনো সময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।








আপনার মন্তব্য প্রদান করুন...